তারুণ্য

মিরাজের সাফল্য আমাদের শিক্ষা

খোরশেদ মাহমুদ

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

মিরাজের প্রতি আমার আত্মবিশ্বাস ছিল। মিরাজ ভালো করবে। কিন্তু অনেকে মিরাজকে টেস্ট দলে নেওয়ার সমালোচনাও করেছিলেন। যা হোক, গত যুব বিশ্বকাপে যেভাবে সে বাংলাদেশকে টেনে নিয়ে গেছে বহুদূর এবং বড় দলের শক্তিমান খেলোয়াড়দের পেছনে ফেলে সেরা খেলোয়াড় হয়েছে তাতে তাকে নিয়ে আশাবাদী না হয়ে পারলাম না। তবে তার কাছ থেকে আমি কিছু রান আশা করেছিলাম। বল হাতে মিরাজ যে চমক দেখাল সেটা তো কল্পনাতীত, বিস্ময় ও পাপ্তি। সে ভালো একজন অলরাউন্ডার সেটা জানতাম। কিন্তু এত ভালো স্পিন বল করতে পারে সেটা জানা ছিল না। বাংলাদেশ দলে স্পিনার সঙ্কট চলছিল খুব। মিরাজকে পাওয়াতে সুখকর ব্যাপার দলের জন্য।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামে জন্ম মেহেদী হাসান মিরাজের। তার দাদা খুলনার পিপলস জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন। সে কারণে মিরাজের বাবা খুলনায় চলে আসেন। গত ১৬ বছর ধরে সন্তানদের নিয়ে খালিশপুরের বিআইডিসি সড়কের নর্থ জোনের ৭ নম্বর প্লটে বৃহত্তর বরিশাল কল্যাণ সমিতির অফিসের পিছনে টিনের বাড়িতে ভাড়া থাকেন তারা। বাবা, মা আর ছোট বোন নিয়ে মিরাজের পরিবারের সদস্য চারজন। বাবা মো. জালাল হোসেন পেশায় একজন অটোরিকশার ড্রাইভার।

মিডিয়াতে শিরোনাম হওয়া মেহেদী হাসান মিরাজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ের অতীত। আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন মিরাজ। ক্রিকেট খেলায় ছোটবেলা থেকেই প্রচ- আগ্রহ ছিল তার। তবে পরিবার থেকে ক্রিকেট খেলায় কোনো সমর্থন পেতেন না বলে লুকিয়ে ক্রিকেট খেলতেন তিনি। ক্রিকেট পাগল ছিলেন মিরাজ। স্কুল ফাঁকি দিয়ে খেলতেন ক্রিকেট। পাড়া-মহল্লার ফুটপাত, গলির ফাঁকা স্থান সবখানেই ক্রিকেটে মেতে উঠতেন। এমনকি ক্রিকেট খেলার জন্য বাবার হাতে মারও খেতে হয়েছে মিরাজকে। তার বাবা জালাল হোসেন এ কথা স্বীকার করে বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমি তার ক্রিকেট খেলাকে সমর্থন করতাম না। আমি গরিব মানুষ, আর সবার মতো আমিও চাইতাম ছেলে ভালো পড়ালেখা করে সরকারি চাকরি করুক। ক্রিকেট খেলে যে সে এতদূর আসবে এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না।’ সবার মুখে ছেলের প্রশংসায় আনন্দিত জালাল বলেন, ‘আমি একজন ক্ষুদ্র মানুষ। আজ ছেলের জন্য আমি যে সম্মান পাচ্ছি তা ভাষায় বলার নয়।’ ছেলের কীর্তিতে বাসায় উপস্থিত হওয়া সাংবাদিকদের জালাল হোসেন বলেন, দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও মিরাজ নিজের সাধনা থেকে সরে আসেনি।

খুলনার কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমির কোচ মো. আল মাহমুদের হাত ধরেই মেহেদী হাসান মিরাজ এতদূর এগিয়েছে। ওই একাডেমি থেকে বয়সভিত্তিক বাছাইয়ে প্রথমেই অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পায় মেহেদী হাসান মিরাজ। অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ২৫ হাজার টাকা জেতে মিরাজ, এরপর অবশ্য তার বাবা আর খেলায় বেশি বাধা দেননি। মিরাজের বাবা জালাল বলেন, এক সময় টাকার অভাবে ব্যাট, প্যাড ও গ্লাভস কিনতে না পারায় মিরাজের খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন কোচ আল মাহমুদ নিজের টাকায় এসব কিনে দেন এবং তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আজকের মিরাজকে তৈরি করেছেন।

মিরাজ মূলত অলরাউন্ডার। অলরাউন্ডার হিসেবেই তাকে দলে নেওয়া হয়। কিন্তু সে অলরাউন্ডারের ভূমিকা রাখতে পারেনি। চার ইনিংসেই সে ব্যর্থ। দল তার কাছ থেকে কিছু রান আশা করে। যুব বিশ্বকাপে কিন্তু সে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিল অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করেই। জাতীয় দলেও তাকে সেভাবে দেখতে চায় সবাই। ব্যাটে রান, বোলিংয়ে উইকেট। সাকিব যেমন। সারা বিশ্বে ক্রিকেট খেলে বেড়াচ্ছে সাকিব আল হাসান। পৃথিবীর সব প্রান্তেই সে উইকেট নিচ্ছে। নিজেকে সে সেভাবেই গড়ে তুলেছে। বোলিংয়ে নানা ভেরিয়েশন আছে বলেই এটা সম্ভব হচ্ছে। তবে নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও সোহাগ গাজীর পর বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো অফ স্পিনার হিসেবে অভিষেকের পাঁচ উইকেট পেলেন মিরাজ। বিদেশের মাটিতেই হচ্ছে আসল চ্যালেঞ্জ, আসল পরীক্ষা। মনে রাখতে হবে এখানে যত সহজে উইকেট এসেছে, দেশের বাইরে ততটাই কঠিন হবে। সেই পরীক্ষায় পাস করার জন্য এখন থেকেই বোলিং নিয়ে কাজ করেতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে ব্যাটিংয়েও। সামনের দিনগুলোতে তার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ, অর্জন ও সাফল্য অপেক্ষা করছে। সেই মুহূর্তগুলোকে লুফে নেওয়ার জন্য তাকে সেভাবে গড়ে উঠতে হবে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগ। কম্পিউটার অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে যে কারো বোলিং রহস্য উদঘাটন করে ফেলে প্রতিপক্ষ। শ্রীলঙ্কার অজন্তা মেন্ডিসকে শুরুতে খেলতেই পারেননি ব্যাটসম্যানরা। সেই অজন্ত আজ কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। আমাদের সোহাগ গাজী, এনামুল জুনিয়াররাও শুরুতে সাড়া জাগিয়েছিলেন। কিন্তু তারা বেশি দূর যেতে পারেননি, হারিয়ে গেছেন। কারণ তারা বোলিংয়ে ভেরিয়েশন আনতে পারেননি। মিরাজকে বোলিংয়ে নতুন বৈচিত্র্য আনতে হবে। তিন-চারটা ভেরিয়েশন নিয়ে বেশিদূর এগোনো যাবে না। নতুন বৈচিত্র্য আনতে হবে। আমি মনে করি মিরাজ সেটা পারবেন। মিরাজের একটি বড় গুণ হলোÑতিনি সব সময় শিখতে চান। সুযোগ পেলেই কোচদের কাছে গিয়ে বসেন, এটা ওটা জিজ্ঞাস করেন, যেটা হাথুরাসিংহে বলেছেন। আর এই জিনিসটাই তাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

সাকিবের মতো বিশ্বসেরা হতে চান মিরাজ। অগ্রজদের সাফল্য অনুপ্রাণিত করে অনুজদেরও। প্রমাণ দেখা গেল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও। বাংলাদেশ যুব দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের ক্ষেত্রে। দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশের কোনো ক্রিকেটারকে আর আদর্শ মানতে হবে না। এখন বাংলাদেশের উঠতি ক্রিকেটারদের। চোখের সামনেই তারকার ছড়াছড়ি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন অনেক রথী-মহারথী। তাদের মধ্য থেকেই উঠতি ক্রিকেটাররা বেছে নেন নিজ নিজ আদর্শ। মেহেদী হাসান মিরাজের সামনেও এখন জ্বলন্ত আদর্শ বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। আগেও বার কয়েক বলেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হতে চান তিনি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার পরও জানালেন, খেলতে চান জাতীয় দলে। হতে চান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। সে জন্য নিজেকে এখন থেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করে তুলবেন মিরাজ। মিডিয়াতে দেখতে পেলাম, এখনই নাকি সীমিত ওভার ক্রিকেটের জন্য মিরাজকে বিবেচনায় আনছে না টিম ম্যানেজমেন্ট। এটা খারাপ সিদ্ধান্ত হবে বলে মনি করি না। তাকে আরেকটু সময় দেওয়া খারাপ হবে না। যদিও অনেকেই মিরাজকে সীমিত ওভার ক্রিকেটে নেওয়ার পক্ষ। এ ফরম্যাটে তার পারফরম্যান্সও ভালো। কিন্তু সীমিত ওভার দলে এই মুহূর্তে ঢোকা মোটেও সহজ নয়। কারণ যারা আছেন তাদের সবাই ভালো পারফরম্যান্স করছেন। তারপরও আমি মনে করি সীমিত ওভার দলে মিরাজের ঢোকার সুযোগ আছে। তার আগে ব্যাটিং পারফরম্যান্স নতুন করে প্রমাণ করতে হবে। বিপিএল আছে, অন্যান্য টুর্নামেন্ট আছে। এখানে যদি তিনি অলরাউন্ড পারফর্ম করতে পারেন তাহলে ওয়ানডে দলের দরজা তার জন্য এমনি এমনিই খুলে যাবে। আমার বিশ্বাস তার ক্যারিয়ার থেমে পড়বে না। কারণ ছেলেটা শুধু মেধাবীই নয়, অনেক পরিশ্রমীও। তিনি অতি সাধারণ ঘর থেকে ওঠে আসা এক যোদ্ধা। এ পর্যন্ত আসতে তাকে পদে পদে সংগ্রাম করতে হয়েছে। মনোবল খুবই শক্ত বলেই তিনি এটা পেরেছেন। এ ধরনের ছেলেরা অনেক দূর যায়। আমার মনে হয় মিরাজও অনেক দূর যাবেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

khurshadmahmud@gmail.com

"