ঋতু পরিক্রমা

বাঙালির পিঠা বিলাস

পঞ্চানন মল্লিক

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

‘চাচা গাছ কাটে চাচি বানায় পিঠা, সেই পিঠা খাইতে দাদা কি যে দারুণ মিঠা’-এমন কথা ও প্রবাদ বাক্য গ্রামেগঞ্জে হরহামেশাই শোনা যায়। এখানে ‘গাছ’ বলতে খেজুর গাছকেই বোঝানো হয়েছে। কার্তিকে যখন দেশে প্রথম শীত আসি আসি করে ঠিক সেই মৌসুমেই শুরু হয় খেজুর গাছ তোলা। এটি বেশ কঠিন একটি কাজ। প্রথমে গাছিরা (খেঁজুর গাছ কেটে যারা বিশেষ প্রক্রিয়ায় খেজুরের রস আহরণে সহায়তা করে সেই শ্রমজীবীদের গ্রাম বাংলায় ‘গাছি’ বা গাছুয়া বলে) শক্ত দা দিয়ে খেজুর গাছের পাতা, গোড়া থেকে অর্থাৎ ডাঁটার বৃন্ত অংশ থেকে কেটে ফেলে দেন। তারপর গাছের এক পাশ সমান করে চেঁচে তাতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নালি কাটেন। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় গাছে ‘চোখ কাটা’। এটি কাটা হয় গাছের সমানকৃত অংশের নিচের দিকে। নালির ওপরের অংশ চাঁচার পর রস গড়িয়ে প্রথমে এই চোখ বা নালিতে আসে। দুই নালির মধ্য অবস্থানে বাঁশের তৈরি খিলান লাগানো থাকে। এটি অর্ধ বৃত্ত পাইপ বা চোঙ আকৃতির হয়। এই খিলানের আগায় গাছের সঙ্গে দড়ি বা বাঁশের পেরেক আকৃতির গোজা দিয়ে ভাড়, হাঁড়ি বা কলসি টাঙানো হয়। খিলান বেয়ে রস ভাড়, হাঁড়ি বা কলসিতে গিয়ে জমা হয়। কখনো কখনো উঁচু গাছের খিলান থেকে রশি বা সুতা ঝুলিয়ে ঘট নিচে স্থাপন করা হয়। সুতা বেয়ে রস নিচে নামে। কোনো কোনো গাছে এভাবে দিনে এক-দুই হাঁড়ি পর্যন্ত রস হয়, কোনো কোনো গাছে তার কম। প্রতিদিন বিকেলে ও সকালে এই ঘট বা হাঁড়ি থেকে রস সংগ্রহ করে একত্র করা হয়। এভাবে সংগৃহীত রস খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি হয়। বিশেষ করে রস জ্বাল দিয়ে যখন একটু ঘন হয়ে যখন লালচে বর্ণ ধারণ করে তখন মিষ্টির পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে একে তাত রস বলে। অনেকে সাঁঝ বেলার রস পেড়ে গ্লাস ভরে পান করেন। রসনা তৃপ্ত করেন মিষ্টি খেজুর রসে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এই রস পান করে নিপা ভাইরাস নামক এক প্রকার ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। এভাবে কাঁচা রস পান করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কাঁচারস পান উচিত নয় বলে ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। নিপা ভাইরাস অবশ্য ছড়ায় বাদুড় জাতীয় পাখির লালার সঙ্গে। খেজুর গাছে পেতে রাখা হাঁড়িতে বাদুড় বা এই জাতীয় অন্যান্য পাখিরা ঠোঁট ডুবিয়ে রস খাওয়ার সময় ঠোঁটের লালা থেকে জীবাণু রসের সঙ্গে মেশে। পরে এ রস কাঁচা অবস্থায় পান করলে পানকারীর দেহে ভাইরাসটি প্রবেশ করে ও তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন।

যাই হোক মিষ্টি খেজুর রস আমাদের অনেকের কাছেই অতি প্রিয়। বিশেষ করে শীত মৌসুমে এই রস পেলে গ্রামের মা বোনেরা মেতে ওঠেন পিঠাপুলি তৈরির উৎসবে। বাঙালি ভোজন বিলাসী বা রসনা বিলাসী, তা কারো অজানা নয়। বিশেষ করে পিঠাপুলি তৈরি ও তা ভোজন বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য। হেমন্তে নতুন ধান উঠলে মা-দাদিরা তা রোদে শুকিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পিঠার জন্য চাল তৈরি করেন। তারপর সেই চাল ঢেঁকিতে ফেলে গুঁড়ি তৈরি করেন। এই গুঁড়ি দিয়ে তৈরি হয় নানা রকম পিঠা। অবশ্য গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকির ব্যবহার এখন প্রায় উঠে গেছে। অনেকে মেশিনে গুঁড়ি তৈরি করে আনেন। অনেকে চালের গুঁড়ির পরিবর্তে ময়দা দিয়েও পিঠা বানান বর্তমানে। পিঠাকে মুখোরোচক করার জন্য গুঁড়ির সঙ্গে মেশানো হয় গুড়, নরিকেল, চিনিসহ নানা সুস্বাদু উপকরণ। যেভাবেই বানানো হোক, পিঠার রয়েছে হরেক রকম নাম। ভাপা পিঠে, পুলি পিঠে, পাটিসাপটা পিঠে, কুলি পিঠে, তেল পিঠে, দুধ পিঠে ইত্যাদি। হরেক রকম পিঠায় শীতে বাঙালি উৎসবে মাতে। শুধু নিজেরা খায় তাই নয়, পিঠা বানিয়ে আত্মীয়-স্বজন বিশেষ করে জামাই-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের দাওয়াত করে আনে। মন ভরে খাওয়ায় মজার মজার পিঠা। কোন জামাই কতটি পিঠা খেতে পারবে, তাই নিয়ে চলে পাল্লা। রসে ভেজানো পিঠার রসে ভরে ওঠে সবার মুখ। মুরব্বিরা খাইয়ে আনন্দ পান। ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ে একটি ছড়া পড়েছিলাম, ‘মামির হাতের দুধ ভাত খেতে বেজায় মিঠে, ঘরে আছে ভাপা পুলি পাটিসাপটা পিঠে।’ এই ছড়াটি শুনলেই বোঝা যায় মামার বাড়ি পিঠা খাওয়ার মজাটা কী। মিষ্টি খেজুর রস আর রসে ভেজানো পিঠা, তাই বাঙালির ভোজন বিলাসিতার এক বড় অংশ। শহর বা মফস্বলে যারা রসে ভেজানো এই পিঠার স্বাদ থেকে বঞ্চিত তাদের জন্য অবশ্য আজকাল রাস্তার পাশে পাটারী গুড় আর চাউলের গুঁড়ি দিয়ে ভাপা পিঠা তৈরি করে বিক্রি করতে দেখা যায় অনেককে। কিন্তু শহরের এই পিঠা, ছেলেবেলায় রসে ভেজানো পিঠার স্বাদের তুলনায় বড়ই তিতা মনে হয়। পিঠা বিলাসী বাঙালিকে তাই অরিজিনাল পিঠার স্বাদ পেতে হলে এই শীতে ক্ষণিকের জন্য হলেও গ্রামে চলে আসতে হবে। মেতে উঠতে হবে পিঠা উৎসবে। আর এভাবেই বাঁচিয়ে রাখা যাবে বাঙালির দীর্ঘদিনের পিঠা ভোজের অভ্যাস ও ঐতিহ্যকে।

লেখক : সাহিত্য সংগঠক, কলামিস্ট

"