কালের স্বর

বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কোন দিকে

আহমদ রফিক

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদ (মূলত সাহিত্যিক) এস ওয়াজেদ আলী লিখেছিলেন, ছোটখাটো, কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘ভবিষ্যতের বাঙালি’। তাতে মূল বক্তব্য ও আকাক্সক্ষা সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক মতাদর্শের বাংলা ও বাঙালি। সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সহিংসতায় বিপন্ন তৎকালীন বাঙালির জন্য একটি শুদ্ধ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হাজির করেছিলেন এস ওয়াজেদ আলী তার বইয়ে।

কিন্তু তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভাষা ও সংস্কৃতিকে পকেটে পুরে এমন এক হিংস্র পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যে, কোনো সৎ মানুষের সৎ পরামর্শই তখন বাঙালি মুসলমানের, অর্থাৎ এর শিক্ষিত শ্রেণির যুক্তি ও চৈতন্যে দাগ কাটার কথা ছিল না। ঘটনা সেদিকেই মোড় নেয়, বিভাজিত হয় ভারত ও বঙ্গদেশ ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে।

এরপর কত পানি বয়ে গেল পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় এবং বিশেষভাবে বুড়িগঙ্গায়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, গণজাগরণ, এমনকি আরোপিত সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই-অভ্যুদয় কথিত ভাষিক জাতিরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’-এর। ভাষার মান রাখার লড়াই হয়ে দাঁড়ায় জাতি ও ভূখ-ের মান প্রতিষ্ঠার লড়াই।

ফলে শিক্ষিত শ্রেণি, এলিট শ্রেণির মহা আয়েশ-আরাম। যেমন ক্ষমতার ব্যবহারে-অপব্যবহারে, তেমনি অর্থনৈতিক ভোগের রাজত্ব তৈরিতে। কিন্তু ভাষা, মাতৃভাষা? কী অবস্থা তার? কী পরিণাম একুশের ভাষিক স্লোগানের, যার অর্থ হলো জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষার অবিকল্প ব্যবহার চাই। চাই বাধাবন্ধনমুক্ত পরিবেশে ভাষার মানসম্মত চর্চা, ভাষার উন্নতি ও সমৃদ্ধ ক্রমবিকাশ।

অনেক ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত যেকোনো স্বাধীন স্বদেশে সমস্যার অন্ত থাকে নাÑ তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, সামাজিক, সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, যা আদতে ভাষিকও। তাই সাধারণ ভাষা, মানসম্মত তথা প্রমিত ভাষা, মুখের ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা বনাম শুদ্ধ কথা ও লেখার ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব রীতিমতো শোরগোল তৈরি করে। প্রধানত তরুণ বা নবীন বনাম প্রবীণ বা বয়সীদের মধ্যে মতের ভিন্নতা। এমনকি প্রমিত বানানরীতি নিয়েও ভিন্নমত, বিশেষত দীর্ঘ উচ্চারণের ডানাকাটা নিয়ে। বাংলাদেশ এ অবস্থার শিকার। বাংলায় এসব শোরগোল একসময় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে হয়তো বা স্তব্ধ হবে, না হলে একপেশে সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা পাবে। তাই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বোধহয় ততটা আশঙ্কার নয়। বরং অশনিসংকেত অন্যত্র, অর্থাৎ ভাষাচর্চায় উদাসীনতা ও অবহেলার দিকটিতে। ভাষার মান রক্ষা তথা মানসম্মত ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে যেখানে অপরিহার্য নির্ভুল ভাষাচর্চা অর্থাৎ লেখা, বলা ও উচ্চারণের শুদ্ধতা নিশ্চিত করা।

জানি, শুদ্ধতার প্রশ্ন উঠলেই ভিন্নমত তথা বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, মাটির গন্ধ ও আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ট্যবিষয়ক যুক্তিতে, যে-যুক্তি ধোপে টেকে না। টেকে না এ কারণে যে আঞ্চলিক ভাষাগুলো পরস্পর থেকে এতটা ভিন্ন এবং কখনো কখনো পরস্পরের কাছে এতটা দুর্বোধ্য (যেমনÑখাস চট্টলার সঙ্গে খাস সিলেটি উপভাষার) যে তাদের একবিন্দুতে মেলানো অসম্ভব।

তাহলে কাকে মান্য করব সর্বজনগ্রাহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে। কথ্যভাষার ভিন্নতা থাকে, থাকবেই; কিন্তু সর্বজনবোধ্য একটি ভাষিক মাধ্যম তো দরকার, যা সর্বব্যবহারিক। যেমন বক্তৃতায়-ভাষণে, সংবাদপত্রে, সাহিত্যে। সেটা ঐতিহ্যবাহী ভাষিক রূপ নিয়ে দেখা দিলে স্বাতন্ত্র্যবাদীদের মহা-আপত্তি, তাতে নাকি মাটির গন্ধ, মাটির বৈশিষ্ট্য, স্থানিক চরিত্র থাকবে না, স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত হবে।

এ-জাতীয় মতের ধারকদের হাতে কিন্তু বাস্তব বিকল্প ধরা দিচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে না আধুনিক চরিত্রের মানসম্মত তথা প্রমিত ভাষা। লুপলাইনে চলতে আগ্রহীদের বোঝা উচিত যে, প্রচলিত ব্যবহারিক ভাষাতেই প্রতিভাবান বা শক্তিমানের হাতে সম্ভব মাটির ঘ্রাণ, স্থানিক রং ফুটিয়ে তোলার কাজটি সুসম্পন্ন করা। ভাষার ইতিহাস তেমন সাক্ষ্যই দেয়।

বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তনের অনুপুঙ্খ বিচারে তেমন সত্যই উঠে আসবে। বিদেশি বা অস্থানিক ভাষার তথা শব্দের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রটি বিচার করে দেখতে গেলে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু সেখানে জবরদস্তির সুযোগ নেই। সে চেষ্টা দেখা গিয়েছিল পাকিস্তানি উন্মাদনার দিনগুলোতেÑসেই ১৯৪২ থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে নামিদামি লেখকদের বৃহৎ অংশ ভাষার ক্ষেত্রে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত উন্মাদনার শিকার।

এর পেছনে মূল কারণ ছিল চেতনায় সংকীর্ণ রাজনৈতিক একদেশদর্শিতার দূষণÑযে দূষণ যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলার চেষ্টা চলেছে স্বাতন্ত্র্যের নামে। সে-স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় স্বকীয়তাভিত্তিক।

ধর্মীয় চেতনাযুক্ত বিষয় বরাবরই উন্মাদনা যুক্ত হয়ে থাকে বলেই বোধ হয় আবুল মনসুর আহমদের মতো সাহিত্যিকও একদা ‘কালচারাল অটোনমি’র ফাঁদে ধরা পড়েন, পড়েন সৈয়দ আলী আহসানের মতো শক্তিমান কবি বা ফররুখ আহমদের মতো প্রতিভাবান। ধর্মীয় পাচনের এমনই মহিমা।

আমার ধারণা, ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে একাংশে সেই ধর্মীয় রাজনৈতিক চেতনার প্রভাব সাহিত্য অঙ্গনের সর্বক্ষেত্র থেকে পুরোপুরি দূর হয়নি, বরং আধুনিক মোড়কে তার রূপান্তর ঘটেছে, যুক্তিগুলোর চরিত্রবদল ঘটেছে, এই যা। আর তা কখনো স্থানিক ঐতিহ্যের নামে, কখনো লোক-সংস্কৃতির নামে, কখনো ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রভাবমুক্তির অযৌক্তিক তত্ত্বে ভর করে।

দুই

এমন সব দ্বন্দ্বের মুখে ভাষাচর্চার উন্নত চরিত্র ব্যাহত হচ্ছে বলে আমার ধারণা। এর প্রকাশ প্রধানত কথ্যভাষায় পরিস্ফুট, যে জন্য আপত্তিকর মিশ্র ভাষার উদ্ভব ঘটছে বাংলায়, যা আবার আধুনিকতার ও বিশেষ ঐতিহ্যের আবরণে যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে। ইংরেজি-হিন্দির যুক্তিহীন বা জবরদস্তির দূষণে ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি দুর্বল হচ্ছে। নতুনত্বের নামে, স্থানিক চেতনার নামে এ মিশ্রণ আসলেই ভাষিক দূষণ। আবারো বলি, এ-জাতীয় দূষণে ভাষার শক্তি বাড়ে না, তাতে দুর্বলতারই আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশে এ-জাতীয় দূষণে বেশ কিছুকাল থেকে শক্তিমান ভূমিকা পালন করছে এফএম রেডিওর অরুচিকর পাচন, যা আবার বিনোদনের নামে তরুণদের প্রভাবিত করছে। এ দূষণ মূলত শাব্দিক ও ভাষিক। সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। থাকলে সংগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাদের বিবেচনায় আসত। প্রায় একই রকম উদাহরণ দেখা যায় টিভির টক শো-নামীয় উদ্ভট ভাষিক লড়াইয়ের জায়গাগুলোতে। সেখানে টকের চেয়ে তেতো ঝাঁজই বেশি।

পূর্বোক্ত ইংরেজি মাধ্যমের প্রবল দাপট, ইংলিশ ভার্সন নামের উপদ্রবের মুখে বাংলা শিক্ষা ও বাংলাচর্চা যখন ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করেছে, যেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণহীনতার উদারতা প্রকট সেখানে যদি যুক্ত হয় শুদ্ধ বা মানসম্মত ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে উদাসীনতা, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কোথায় গতি হবে শুদ্ধ বাংলা ভাষাপ্রেমী বাঙালির?

মহানগর ঢাকার রাজপথে বের হলে চোখে পড়বে দোকানের নামপত্রে, সাইনবোর্ডে, বিজ্ঞাপনী বার্তায় বাংলা বানান ভুলের মহোৎসব। কোথাও কোথাও তা মারাত্মক চরিত্রের এক সরণির বানান যে কত মাত্রায় পরিস্ফুট, তা দেখে ভিরমি খেতে হয়। তা ছাড়া দোকানপাটের নামকরণে ‘দি’, ‘এন্ড’ এবং ‘নিউ’র ব্যবহার মহামারীর চরিত্র ধারণ করেছে। দৈনিক পত্রিকার একটি খবর দেখে ভালো লাগল এবং মনের হতাশায় এলো একফালি স্বস্তিদায়ক হাওয়ার ঝাপটা যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কাকতাড়ুয়া’ নামে একটি সংগঠন ভুল বানানের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। ঢাকায় এমন চেষ্টা বাংলা ভাষা শিক্ষক পর্ষদ-এর মতো দু-একটি সংগঠন শুরু করলেও দরকার ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যাপক আন্দোলন। বায়ান্নর ঢাকা এদিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে।

বাংলা ভাষার সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বহু বিষয়ে প্রতিবাদী তৎপরতা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভাষার বিকৃতি রোধে। তা ছাড়া রয়েছে অনুষ্ঠানাদিতে, আমন্ত্রণপত্রে ইংরেজির একচেটিয়া আধিপত্য। যে বাঙালি-গৃহকর্তা একসময় সব রকম নিমন্ত্রণপত্রে, সন্তান বা আবাসন বা বাসস্থানের নামকরণে বাংলা ব্যবহারে গর্ববোধ করতেন, তাদের বা তাদের উত্তরসূরি প্রায় সবারই বর্তমান গর্ব ইংরেজি ভাষার ব্যবহারে।

সংস্কৃতিমনস্ক যে-মানুষটি বিভিন্ন উপলক্ষে একসময় বই উপহার দিয়ে আনন্দ পেতেন তার উত্তরসূরিদের কাছে সে রীতি এখন বৈষয়িক বিবেচনায় মূল্যবান আধুনিক সামগ্রী উপহারে বিকোয়। অলঙ্কার বা দামি পোশাক-পরিচ্ছদ সাংস্কৃতিক মননশীলতার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। ভাষা বা ভাষিক সংস্কৃতি এমনইভাবে নানা মাত্রায় বিপন্ন অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ‘বাংলা আমার গর্ব, বাংলা আমার অহংকার’- এর আবেগ এখন নানা টানে ফেরারি।

এ সবকিছুর পেছনে রয়েছে মূলত শক্তিমান শ্রেণিস্বার্থ- অন্যদিকে সা¤্রাজ্যবাদী, ভোগবাদী সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক প্রভাব। সমাজে বিজ্ঞান কমপ্রেডর শ্রেণির দেশপ্রেমহীন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিদেশপ্রীতি, করপোরেট পুঁজির সঙ্গে গভীর আঁতাত। কেউ কেউ এই অর্থনৈতিক উন্নতিকে ভাষিক সংস্কৃতির উন্নয়নে সুলক্ষণ বলে মনে করে; কিন্তু আমি তা করি না। কারণ এ উন্নয়ন শ্রেণিবিশেষের সমৃদ্ধিতে সমর্পিত, সর্বজনীন স্বার্থে তার সামান্য কাজে লাগে।

ভাষার শিকড়ছোঁয়া উন্নতির ক্ষেত্রে একটি বড় প্রয়োজন ছিল গোটা জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার। গত ৪৩ বছরে জাতীয় জীবনের পক্ষে অতীব প্রয়োজনীয় কাজটি করা হয়নি। বাংলা ভাষার বই বিকিকিনির ক্ষেত্রে বিষয়টি গভীর সুপ্রভাব রাখতে পারত, যদি এর অন্যান্য দিকের কথা নাও বলি। ভাষার সামাজিক প্রয়োজনের দিকটি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করতে পারে মাতৃভাষাচর্চার ব্যাপকতায়।

শিক্ষা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র মাতৃভাষাচর্চার ক্ষেত্রে ক্রমে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ অবশ্যই বাংলাকে শিক্ষায়, বিচারব্যবস্থায়, সর্বোপরি জীবিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত না করে বিদেশি ভাষাকে সেখানে ব্যবহার করা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভাষার সঙ্গে যত আবেগ জড়ানো থাকুক না কেন, অর্থ ও অর্থনীতি ভাষার চেয়ে অধিকতর নিয়ামক শক্তি। সেখানেই মাতৃভাষা বাংলার অবস্থান নিয়ে আমাদের বড় ঘাটতি। বুঝে বা না বুঝে এ সর্বনাশটি আমরা ঘটিয়েছি। এ সর্বনাশের দায় মোচন এ বিন্দুটি থেকেই শুরু করতে হবে। এ পথেই ভাষিক জাতিরাষ্ট্রে বাংলার ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে পারে। তা না হলে বাংলা শুধু সাহিত্যের ভুবনেই টিকে থাকবে, জাতিরাষ্ট্রে ও সমাজে সমৃদ্ধ মাধ্যম হয়ে উঠবে না।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষা সংগ্রামী

"