মৃত্যুর পরও চিরঞ্জীব ফিদেল কাস্ত্রো

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

বিশ্বের মহান এক বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো আর নেই। কিউবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার ছোটভাই প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর দৃঢ় অথচ কাঁপা কণ্ঠের এ ঘোষণা প্রচারিত হয় শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে দশটায়। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে রটে যায় ৯০ বছর বয়সী এক মহান বিপ্লবীর জীবনের পরিসমাপ্তির সংবাদ। ফিদেল ছিলেন সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের এবং সেই সঙ্গে সব নিপীড়িত জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু ও অভিভাবক। এক বিপ্লবী আইকন। তার মৃত্যুতে বিশ্বের নিপীড়িত জনগণ ও বিপ্লবীরা সেই বন্ধু ও অভিভাবককেই হারাল। তার মৃত্যুতে এসব জনগণ ও বিপ্লবী অবশ্যই শোকাভিভূত। তবে সেই শোকের বিপ্লবী প্রকাশ মূর্ত হয়ে উঠেছে তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষণার সময় তার ভাই রাউল কাস্ত্রোর বিপ্লবী সেøাগানÑ‘টুওয়ার্ডস ভিক্টরি, অলওয়েজ’-এর মধ্য দিয়ে। সব মৃত্যুই শোকের। তবে কোনো কোনো মৃত্যু চীনা সেই প্রবাদের মতোÑ ‘কোনো কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী’। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুও তেমনই। তার মৃত্যুতে কিউবাবাসী ও বিশ্বের তাবৎ নিপীড়িত জনগণের সঙ্গে আমরাও শোকাভিভূত। কারণ তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালে সব সময়ের অকৃত্রিম বন্ধু। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন থেকে শুরু করে সব আন্তর্জাতিক ফোরামে ছিলেন আমাদের সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।

বিপ্লবী এই আইকন ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিচিত এক রাষ্ট্রনায়ক ও জননেতা। সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী হিসেবে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আজীবন শত্রু। অসংখ্যবার তিনি মার্কিনিদের হত্যা চেষ্টার শিকার যেমন হয়েছেন, তেমনি অসংখ্যবার তার মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয়েছে সে দেশের সংবাদমাধ্যমে। তাদের মুখে ছাই দিয়ে প্রতিবার তিনি তার সপ্রতিভ বুদ্ধিমত্তা ও অকৃত্রিম বিশ্বাস দিয়ে তার মোকাবিলা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরণশীল নিয়তির চিরসত্যকে মেনে তাকে জীবনাবসান মেনে নিতে হয়েছে গত শুক্রবার শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের পর। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ও বিপ্লবী নেতার বয়স ও স্বাস্থ্য যেকোনো সময়ই তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা হতে পারার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তার পরও এই সংবাদ যখন ঘোষিত হলো তখন তা কিউবা ও বিশ্বের নিপীড়িত জনগণকে স্তম্ভিত করার মতো আঘাত হিসেবে উপস্থিত হলো। কমান্ডান্তে অর্থাৎ উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা আর নেই বলে বার্তা রটে গেল সর্বত্র।

তার মৃত্যুসংবাদ এমনই যে তা তার বন্ধু ও শত্রু উভয় মহলকেই সমানভাবে তাড়িত করে। ফিদেল কাস্ত্রো এমন এক নেতা, যার তার দেশে নামে কোনো সরণি নেই, নেই কোনো স্ট্যাচু বা মূর্তি। কারণ তিনি তা চাননি কোনো সময়ই। কিউবাবাসী সবার অন্তঃস্তলে এবং কিউবার মাটির প্রতিটি কণায় তিনি মিশে থাকার এক অনন্য সক্ষমতা গড়ে তুলেছেন নিজ মহিমায়। শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যব্যবস্থায় এক বিপ্লব আনেন বিপ্লবোত্তর কিউবায়। কিউবাসহ সমগ্র লাতিন আমেরিকায় তার বিনা মাশুলের এই শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা সরবরাহ এক অনন্য কীর্তি। আর এসবই সবার মনে তাকে চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে।

ঐতিহাসিকরা কাস্ত্রোর কর্মজীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে দশকের পর দশক বিতর্ক করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। কিন্তু তার বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর কিউবার সাফল্য ও ব্যর্থতা কোনো গোপন বিষয় নয়। সবকিছুর প্রকাশ্য প্রতিচ্ছবি হচ্ছে আজকের কিউবা। এমনকি এখন যে অর্থনৈতিক সংস্কারমূলক কাজ চলছে তার পরেও সবকিছুর মধ্যে ছাপ রয়েছে অর্ধশতক সময়ের ফিদেলবাদের। এখানেই ফিদেল কাস্ত্রোর সাফল্য। চিরঞ্জীব স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবেন ফিদেল কিউবাবাসী ও বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের হৃদয়ে।

 

"