প্রত্যাশা

নারী সহিংসতা রোধের কতদূর?

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অলোক আচার্য্য
ADVERTISEMENT

এ বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী আর অর্ধেক তার নর। কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এই কবিতার লাইন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর মঙ্গলময় সৃষ্টিতে নারীর রয়েছে সমান অবদান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কিন্তু অতীতকাল থেকেই নারীরা অবহেলিত। অথচ আমরা নারীর ওপর সহিংসতার আগে ভুলেই যাই যে, এ রকমই কোনো নারীর দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করা তীব্র যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করার কারণেই আজ আমরা এই পৃথিবীতে। পৃথিবীতে আজ আমরা যে অধিকার বলে চিৎকার করি সে অধিকার আদায়ের শুরুটা পৃথিবীর আলো দেখিয়ে একজন নারীই করেছে। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করে নিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। নারীর কাজ যে শুধু সন্তান জন্ম দান নয় তা বোঝাতেই কেটে গেছে অনেক বছর। নারীদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। ঘরের কোণ থেকে বের হয়ে আজ মহাশূন্য পর্যন্ত তাদের পদচিহ্ন রাখছে সফলতার সঙ্গে। তবে কাজের ক্ষেত্র বাড়লেও কমেনি নারীর ওপর সহিংসতার হার। বরং দিন দিন সহিংসতার নতুন নতুন ঘৃণ্য রূপ সমাজকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। যে সহিংসতা থেকে বাদ পড়ছে না তিন থেকে ত্রিশ বা তদূর্ধ্ব বয়সী নারীরা। তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখা হচ্ছে, বাসে ট্রামে গণধর্ষণ শেষে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব করেও নারীরা আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সমান অংশীদার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অর্ধেক শক্তি। নারী শক্তি বাদ দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা অসম্ভব।

কিছু মানুষের বর্বরতায় কুলষিত হচ্ছে সমাজ জাতি দেশ। ধর্ষণ নামক এক নোংরা মানসিকতায় সমাজের কিছু মানুষ আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে। তারা ধর্ষণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। সেখানে কোনো মায়া নেই, মানবিকতা নেই কোনো সংকীর্ণতাবোধ নেই। তিন বছর থেকে শুরু করে সব বয়সী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটা এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই কয়েকটি করে ধর্ষণের খবর মিলছে। এটা তো গেল পত্রিকায় যা আসছে তার কথা। তার বাইরেও তো নারীদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। যেগুলো অনেক সময় লোক চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। সেসব যোগ করলে অনেকটা ভয়ঙ্কর শোনায়। প্রতিদিন প্রতিমাস এমনকি প্রতিবছর এ সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ধিক্কার উঠছে তাদের ঘিরে, তবে সেসব অমানুষদের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটানো যাচ্ছে না। তাদের কর্ণকুহরে আমাদের ঘৃণার বাণী পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাদের মনের ঘৃণ্য অন্দরে শুধুই অন্ধকার। অমানুষদের কামনার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে বিবেকপূর্ণ সমাজ। নিরাপদ করতে চেয়েও পারছি না। বাসযোগ্য করতে গিয়ে বারবার এসব বোধহীন, রুচিহীন মানুষেরা মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসছে। জানি না আর কত দূর সে পথ যেখানে কেবল সভ্য সমাজের সভ্য মানুষেরাই থাকবে। কঠোর আইন রয়েছে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা জোরদার হয়েছে, তবুও যেন এধরনের বিকৃত মানুষদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না নারীদের। বারবার বিবেকের দংশনে দগ্ধ হতে হচ্ছে আমাদের। তবে আমরাও হেরে যাব না। একদিন না একদিন এ পৃথিবী নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধা দিয়ে বাসযোগ্য করে যাব। আমরা ততদিন প্রতিবাদ করে যাব যতদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধ না হয়।

সম্প্রতি খাদিজার ওপর হামলাকারীর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে ডাস্টবিন বানিয়ে সেখানে থুতু ছিটিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। এসব সমাজের নিকৃষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত থুতু ফেলে ঘৃণা করে যাই। থুতু ছিটানো প্রতীকী আর ঘৃণা প্রকাশ মূল উদ্দেশ্য। কতটা ঘৃণা এসব মানুষের প্রতি আমাদের মনে জমা হয়ে আছে এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমাদের সমাজে এরকম মানুষ এখন অনেক বেশি। ক্রমেই এদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এদের আবার ঘৃণাবোধের অনুভূতিটুকুও নেই। খাদিজার আগেও অনেক মেয়েকে এরকম ঘটনার শিকার হতে হয়েছে। যারা নারীর প্রতি অত্যাচার করে তারাও আমাদের মতো সভ্য সমাজের মুখোশধারী বাসিন্দা। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ।

নারীর ওপর নির্যাতন করার আগে ভাবতে হবে নারীর প্রতি আমার দায়িত্ব নির্যাতন নয়, বরং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। পেশিশক্তির যুগে নারীর ওপর পেশিশক্তি দেখানোর ভেতর কোনো বীরত্ব নেই। বীরত্ব তো কেবল ভালোবাসায়। কোনো সত্যিকারের পুরুষ তার পৌরুষত্ব ঘৃণ্যভাবে ফলানোর চেষ্টা করে না। পুরুষ তো সে যে তার পৌরুষত্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে সবার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই নারীর প্রতি আর সহিংসতা নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

 

"