জীব হত্যা মহাপাপ

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

মিজান মনির
ADVERTISEMENT

‘অহিংসা পরম ধর্ম’, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’Ñএসব নীতিকথা বলেছেন গৌতম বুদ্ধ। মানবতাবাদী হিসেবে জগৎসংসারে তিনি বেশ খ্যাতিও কুড়িয়েছেন। প্রবর্তন করেছেন বৌদ্ধ ধর্মের। এ ধর্মের অনুসরণ করে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি মিয়ানমারে? এটা কোন ধরনের অহিংসার নমুনা! তাহলে কি মিয়ানমারের লোকদের কাছে মুসলমানরা ‘জীব’-এর সংজ্ঞায় পড়ে না? নারী-পুরুষ এমনকি অবুঝ শিশুর চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের আকাশ-বাতাস। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ কিন্তু রোহিঙ্গা হত্যা কি ‘মহাপূণ্য’? ‘অহিংস পরম ধর্ম’ কিন্তু রোহিঙ্গা গণহত্যাও কি পরম ধর্ম? ‘সংসার ধর্ম ত্যাগ কর’ কিন্তু পৃথিবীর সব বৌদ্ধই সংসার করছে! বাস্তবতা হলো, মুসলিম নিধনে সবাই এক কাতারবদ্ধ!

সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। যদিও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনে বৌদ্ধদের হামলা নতুন নয়। সম্প্রতি এই পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। অন্যদিকে দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কোনো অবস্থান নিতে না পারায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচির নোবেল কেড়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে। এ দাবিতে অনলাইনে এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন লক্ষাধিক মানুষ। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাভাষী সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের জাতিগত দ্বন্দ্ব চলছে। এ নিয়ে সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। যদিও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গত সপ্তাহে সেনাবাহিনীর ওই অভিযানে অন্তত সাড়ে ৩০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, রোহিঙ্গারা সর্বপ্রথম জুলুমের শিকার হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন বার্মার খ্রিস্টান রাজা সে সময় আরাকান দখল করে নেন। এরপর রোহিঙ্গারা বড় ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ১৯৪২ সালে, যখন জাপান বার্মা দখল করে নেয়। এসব নির্যাতনের সব মাত্রা ছাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের পর থেকে। নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করে ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের ফলে। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর বাতিল হয়ে যায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। তখন থেকে মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারও অচল হয়ে পড়ে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয় বার্মা সরকার। কয়েকশ’ বছরের পিতৃভূমিতেই তাদের বলা হচ্ছে অবৈধ অভিবাসী। নিজেদের দেশে তারা বর্তমানে প্রবাসী। কিন্তু কেন? তাদের অপরাধ কী? এদের রোহিঙ্গা বলতে নারাজ বার্মা সরকার এবং বার্মার বৌদ্ধরা। তারা এদের ডাকে বাঙালি বলে। সে থেকেই বার্মায় মুসলিমদের গণহত্যা চলে আসছে। প্রায়ই রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি কখনো সামরিক বাহিনী, কখনো স্থানীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধরা আবার কখনো উভয়পক্ষ মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় কয়েক হাজার মানুষকে। যে হত্যাযজ্ঞ এখনো চলমান। ‘বৌদ্ধ অহিংস ধর্ম এবং জীব হত্যা মহাপাপ’ হলে এই হত্যাযজ্ঞ কেন? এমনটাই প্রশ্ন উঠেছে শান্তিপ্রিয় জনমনে। এখন প্রশ্ন উঠছেÑরোহিঙ্গারা মানুষ নয়; নিজ দেশে তারা ভোটাধিকারহীন অনাগরিক। সেখানে কচুকাটা করা হচ্ছে তাদের। বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সক্ষম, তাদের প্রবেশরোধ এবং ইতোমধ্যে প্রবেশকারীদের সে দেশে ফিরিয়ে দিতেও আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কেন? তারা কি আদৌ মানুষ নয়! রোহিঙ্গারা এখন কী করবে? পাখি হয়ে আসমানে উড়বে? কিছুই তারা বুঝতে পারছে না। জাতিসংঘ এবং জগৎমোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও পদক্ষেপই বা কী? ক্রমশই অন্যায়-অনাচার অপ্রতিরোধ্য ও প্রতিকারহীন হয়ে উঠছে আমাদের এই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে।

তথাকথিত মানবতার দাবিদার অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের অধিকারের সপক্ষে কথা বলছেন না। তার এই অমানবিক এবং অন্যায্য সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। অবশেষে অং সান সু চিকেও বর্ণবাদী বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে মুক্ত হওয়ার পর একবারও তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে মানবিক কোনো কথা উচ্চারণ করেননি। বিগত নির্বাচনে তিনি তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি-এনএলডির পক্ষ থেকে একজন মুসলমান প্রার্থীও দাঁড় করাননি। এখন সু চির মনোভাব এতটাই অনমনীয় যে, হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তিনি শুধু নিশ্চুপই নন, সেখানকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টক মার্শেলকে বলেছেন, অত্যাচারিতদের রোহিঙ্গা নামে না ডাকতে। বিস্ময়ের ব্যাপার শত শত বছর পরও সু চি তথা মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি মুসলিম বলে অভিহিত করতে চায়। মিয়ানমারে যে প্রকাশ্য ও গুপ্ত গণহত্যা চলছে, তার অবসান চাই। জয় হোক মানবতার। বেঁচে থাকুক মানব ধর্ম।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

 

 

"