রোহিঙ্গা গণহত্যা

আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

মো. শরীফুর রহমান আদিল
ADVERTISEMENT

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নির্মমতা থামছে না। বরং দেশটির নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গা গণহত্যাকে বৈধতা দিতে চলেছেন। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। আফগানিস্তান কিংবা ইরাকের হামলা কিংবা গুয়েন্তানামো বে কারাগারে নির্যাতনের কথা শুনেছি। কিন্তু বর্তমান মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত বর্বর নির্যাতন যেন সব ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আরাকান যেন হয় গুয়ান্তানামো কারাগারেরই সংস্করণ! যেখানে কারাগার নামকরণ না করলেও শত শত গ্রামকে তারা কারাগারের আদলে ব্যবহার করছে নির্লজ্জভাবে। যেখানে গণমাধ্যমের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, নেই কোনো মানবাধিকার সংগঠনের স্বাধীন তদন্ত করার সুযোগ। এই নির্মম মানবতা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম তাদের ইজ্জত, প্রিয়জনকে বিসর্জন দিচ্ছে। তারা বাংলাদেশসহ পাশের দেশের সীমান্তে পালিয়ে এসে হাহাকার আর আর্তনাদ করছে। কিন্তু কেউ যেন কারো নয়।

একমাত্র চীন, বাংলাদেশ আর তুরস্ক ছাড়া সবাই যেন চাচ্ছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা আয়লানের মতো ভেসে যাক! জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বাংলাদেশের প্রতি সীমান্ত খুলে দেওয়ার অনুরোধ করছে। কিন্তু তাদের এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমার সরকারকে নৃশংসতা বন্ধের অনুরোধ করছে? কেন এসব সংস্থা মিয়ানমার সরকারকে তাদের এই লোমহর্ষক নির্যাতন বন্ধে বাধ্য করতে পারছে না?

কেন মিয়ানমার সরকারকে এসব সংস্থা চাপ প্রয়োগ করতে পারে না? কেন মিয়ানমার সরকারকে ‘রোহিঙ্গা বিদ্রোহী’ দমনের নামে গণহত্যা থামাতে বাধ্য করছে না? কেন বারবার বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাদের অনুরোধ? বাংলাদেশ কী কেবল মানবতাবোধ দেখাতে পারে, অন্যদের মধ্যে কী সেই মানবতাবোধ নেই?

মধ্যযুগকে আমরা অন্ধকার যুগ হিসেবে বিবেচনা করি, কারণ সে সময় সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করত গোষ্ঠী। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবে, এখনকার সময়েও গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায় দ্বারা সবকিছু নিয়ন্ত্রিত নয়? যে মানবতাবাদের জয়গান নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উদ্ভব হয়েছিল আধুনিক যুগের, সেই মানবতা মিয়ানমারে আজ উপেক্ষিত কেন?

বাংলাদেশের নাসিরনগরে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই উদ্বেগ আজ কোথায়? জাতিসংঘসহ তাদের শরণার্থী সংস্থা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনার অভিযোগ তুলছে, কিন্তু মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচারের কথা বলা হচ্ছে না কেন? ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার ক্ষেত্রে যে বিচার মিয়ানমারের ক্ষেত্রে কেন সেই বিচার চায় না ন্যাটো? নোবেল শান্তি পুরস্কারের মর্যাদাও তো রক্ষা করতে হবে। অং সান সু চি যদি এই গণহত্যায় সমর্থনই দেন তাহলে তার শান্তিতে নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা তো তিনি হারালেন। নোবেল কমিটিও কী বিষয়টি ভেবে দেখবে?

প্রায় ৭৪ বছর ধরে রোহিঙ্গারা থেমে থেমে এসব লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার এবং প্রায় ২৭ বার মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সমূলে উচ্ছেদ কিংবা নিঃশেষ করতে অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু এই ৭৪ বছরে জাতিসংঘ, ওআইসি কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের রক্ষায় স্থায়ী সমাধানের কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। যখনই এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তখনই কেবল বাংলাদেশ তার সীমানা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এবার বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে কার্পণ্য করছে বলে মনে হয় না। তবে সতর্ক বলতে হবে। কেননা বিগত বছরগুলোয় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দায়ভার এখনো বাংলাদেশ বহন করছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি অবৈধ অধিবাসী বলে আসছে। এবার বাংলাদেশ যদি সব রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়, তবে মিয়ানমার সরকার কি তাদের আর ফিরিয়ে নেবে? এ ক্ষেত্রেও কি জাতিসংঘ বা তার শরণার্থী সংস্থা কোনো উদ্যোগ নেবে? নাকি মিয়ানমার সরকারের আসল উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে বলে পরে মুখ ফিরিয়ে নেবে?

আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার অনুরোধ বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পর তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার লিখিত অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর হতে পারে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আশ্রয় প্রদান কোনো স্থায়ী সমাধান নয় রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ও টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে। যেমনÑমিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে ১৯৮২ সালের আইন বাতিল করা, ১৯৭৮ সালের আইন পরিবর্তন করে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, রোহিঙ্গা আরএসওর (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন) সঙ্গে শান্তি চুক্তি করা। রোহিঙ্গা সুরক্ষা আইন করে তা বাস্তবায়ন করা, অন্যথায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা। রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় বৌদ্ধদের রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা না চালানোর ব্যবস্থা করা। রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে ২৫ বছর বার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া, শিক্ষা, চাকরি সব জায়গায় ১০ শতাংশ কোটা চালু করা, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা ও রোহিঙ্গাদের জীবনমান দেখতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর শাখা খোলা। উপরোক্ত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, মানবাধিকার সংস্থাসমূহের মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষক

adil_jnu@yahoo.com

 

 

"