শিশুদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা হোক

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

মেগাসিটি ঢাকা মহানগরী এখন শিশুদের জন্য এক বন্দিশালা। কী গৃহ, কী স্কুল সব জায়গাতেই শিশুরা গৃহবন্দি। তার বাসাবাড়িতে নেই একটু হাত-পা ছড়িয়ে দৌড়াদৌড়ির জায়গা, মহল্লায় নেই খেলার মাঠ বা স্বাধীনভাবে বেড়ানোর স্থান এবং স্কুলে নেই খোলা মাঠ। ফলে ঢাকা মহানগরীতে সবচেয়ে অসহায় সম্ভবত শিশুরা। পাড়া-মহল্লায় শিশুদের খেলার মাঠ তো দূরের কথা চলাফেরার রাস্তাও ঠিকমতো রাখা হয়নি বাড়ি বানানোর বেলায়। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে শুক্রবারের প্রতিদিনের সংবাদে এক ভয়াবহ তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাজধানীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১১ হাজার ৩২৮টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে খেলার মাঠ রয়েছে মাত্র ৫৬৭টিতে। অবশিষ্ট ১০ হাজার ৭৬১টি বিদ্যালয় কেবলি দালান। স্কুল অনুমোদন নীতিমালায় খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হয় না। এমনকি অনেক বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে শিশুদের টিফিন পর্যন্ত খেতে হয় শ্রেণিকক্ষে বসে। একইভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাগজে-কলমে বিশাল এ ঢাকা নগরীর জন্য মাত্র ২৫টি খেলার মাঠের হিসাব থাকলেও অস্তিত্ব আছে মাত্র ১০টির। সেগুলোও হয় বেসরকারিভাবে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কিংবা রিকশা, ভ্যান ও ট্রাকের দখলে চলে গেছে। তাহলে শিশুদের খেলাধুলা দূরের কথা প্রাণ খুলে, একটু দৌড়াদৌড়ির সুযোগ কোথায়?

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও গবেষণাকর্মীরা তাদের অভিমত ও গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়ে শিশুদের খেলাধুলার প্রয়োজনকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একটি শিশুর কল্পনাশক্তি, সামাজিক, শারীরিক ও আবেগজনিতভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে খেলাধুলা বিকল্পহীন বলেই মত দিয়েছেন তারা। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারক এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে শিশুদের খেলাধুলার মতো এ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনটির কোনো পাত্তা আছে বলে মনে হয় না। তা না হলে এ ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি ও উদ্যোগ নেই কেন? নগর পরিকল্পনা থেকে নগর ব্যবস্থাপনায় শিশুদের জন্য স্থান ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে এ কার্পণ্য মূলত অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতারই নামান্তর। কানাডিয়ান সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইয়ুথ এনগেজমেন্টের সমীক্ষায় দেখা গেছে, খেলাধুলায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শিশু তার হতাশার মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম হয়, শারীরিকভাবে কর্মক্ষম হয় এবং স্কুলের লেখাপড়ায় ভালো ফল করে। সেই সঙ্গে সামাজিকভাবে সে তাদের বন্ধু, প্রতিবেশী ও পরিবারের প্রতি অনেক বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তাহলে শিশুর জন্য খোলা মাঠ বা স্থান না রেখে কিংবা খেলার মাঠ না রেখে আমরা আমাদের শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি আজকের শিশুই আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় সব কর্মকান্ডের নিয়ামক। অর্থাৎ শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার বা শিশুমনের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ করে জাতির ভবিষ্যতের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছি।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও শিশুদের খেলার অধিকারকে প্রধান মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালের শিশু অধিকার কনভেনশনে শিশুদের খেলাধুলার অধিকারকেই শুধু স্বীকার করা হয়নি রাষ্ট্রকে তার সুবন্দোবস্ত করার কথাও বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানেও সবার সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আমাদের বোধে এসব নাড়া দেয় না বলেই আমরা বুঝতে চাই না পূর্ণবয়স্ক ও শিশু এ দুই বয়সের মনোভাব প্রকাশ ও হৃদয়ঙ্গম করার এবং বিকাশের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। এসব বিষয় আমলে নিয়ে শিশুদের খেলাধুলার মাঠ ও খোলা স্থানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেতন হবে বলে আমরা আশা করতে পারি।

 

"