পর্যটনশিল্প

হতে পারে অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

এস এম মুকুল
ADVERTISEMENT

পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনীতির নাড়ির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনের। এমন উদাহরণও হাতের কাছেই- মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের পর্যটন স্পটের মাঝে বৈচিত্র্য রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশেও এ শিল্পের সম্ভাবনা অফুরন্ত। এ দেশের নদ-নদী, সবুজ-শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, ছায়াঢাকা গ্রাম, শান বাঁধানো পুকুর, গ্রামবাংলার মানুষের সরল জীবন বিশ্বের যে কোনো মানুষের হৃদয় আকৃষ্ট করে। বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্রময় সংস্কৃতি পর্যটনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণ কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০১৮ সাল নাগাদ জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১ হাজার ৯৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটা হবে বৈদেশিক আয়ের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ লাখ ৯১ হাজারে উন্নীত হবে। প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশে পর্যটকদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবাসন সুবিধা, অবকাঠামো সংস্কার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ২০২১ সালে বাংলাদেশের পর্যটন খাত দেশের অন্যতম সমৃদ্ধশালী শিল্পে পরিণত হবে।

দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের প্রাপ্ত ডাটা থেকে দেখা যায়, নব্বই দশকের মধ্যবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পে ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে। পর্যটন শিল্প বিকাশের যথেষ্ঠ সম্ভাবনা থকলেও পাশ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের পাশ্ববর্তী অনেক দেশ এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আশার কথা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন মার্কেটের একটি হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারও পর্যটন কর্পোরেশনের মাধ্যমে এ শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পর্যটন যে আমাদের অর্থনীতির একটি বিশাল খাত হতে পারে এ ধারনার বিকাশ ঘটে মূলত পঞ্চাশের দশকে। এরপর ১৯৯৯ সালে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ খাতে এখন কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ লোকের। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সরকারেরও আছে নতুন পরিকল্পনা। সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশে ৮ হাজার পর্যটন স্পট নির্ধারণ করেছে। আগামী ১০ বছরে তিন ধাপে স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পার্বত্য জেলাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে এসব পর্যটন স্পটগুলোকে আধুনিক ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হবে।

বাংলাদেশের এই পর্যটন কেন্দ্র দেশের রাজধানী থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। রেলে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হলে কম খরচ ও সময় সাশ্রয় হবে।

দোহাজারি হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটারের রেললাইন খুলে দিতে পারে দেশের অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ালে পাল্টে যাবে অর্থনৈতিক চেহারা। সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা টেকনাফ নিয়ে নতুন করে ভাবছে সরকার। টেকনাফকে নিয়ে নতুন যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এর নামকরণ করা হয়েছে প্রিপারেশন অব ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অব কক্সবাজার টাউন এ্যান্ড সী বীচ আপ টু টেকনাফ প্রকল্প। আশার কথা, সরকার পর্যটনের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং অর্থাৎ বিশ্বের পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে নতুন করে উপস্থাপনের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

পর্যটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সাথে অসংখ্য মানুষ জড়িত। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে একটি বড় খাত। পর্যটন একটি বহুমুখি কর্মসংস্থান সৃষ্টির শিল্পখাত। বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে যেমন কেনাকাটা করেন, তেমনি থাকা-খাওয়া এবং যাতায়াতের জন্যও তাদের ব্যয় করতে হয়। ফলে নানা পেশার মানুষ পর্যটকদের সুবাদে আয় করার সুযোগ পায়। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশ। বেকারের আধিক্যও বেশি। সুতরাং পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে বেকারদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। পর্যটনকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করে প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় সুযোগ-সুবিধা দিলে পর্যটকরা অধিক হারে আকৃষ্ট হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু দর্শনীয় স্থানের ওপর ভিত্তি করেই পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠে না। পর্যটনের জন্য প্রয়োজন দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ ও অবকাঠামোগত পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। সরকারকে এই সম্ভাবনাময় শিল্প ব্যবস্থাপনার কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অধিক সুবিধা দিয়ে এই শিল্পে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের প্রতিষ্ঠান বেশি হলে আমাদের লাভ বেশি হবে। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ণের মাধ্যমে এই পর্যটন শিল্পকে কাজে লাগাতে পারলে একইসাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বহুমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

 

 

"