বেদে সম্প্রদায়

তাদের দেখার কেউ নেই

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ০০:০০

সমাপ্তি মুখার্জি
ADVERTISEMENT

অন্য অনেক আদিবাসীর মতো বেদেরাও এই জলমগ্ন ভূমিরই সন্তান। বেদে সম্প্রদায়ের বসবাসের ক্ষেত্রে সাধারণত: সময়ের প্রভাবে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বাস করে এরা। ঢাকার সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এসব বেদের আবাস। তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ এখনও টিকে আছে। বাগেরহাট, পিরোজপুর, সুনামগঞ্জের সোনাপুরে বাস করে বেদে সমাজের বৃহত্তর একটি অংশ। আবদুল্লাহপুর, মীরকাদিম, চিতলীয়, মাকহাটি এলাকায় বেদেদের আদি বাস ছিল- এই সব এলাকা থেকেই সম্ভবত তারা ভাটপাড়া, বক্তারপুর, আমিনবাজার প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।

আধুনিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষের পরও বেদেদের জীবন প্রবাহ পশ্চাদপদ। সামাজিক ও নাগরিকসহ অনেক মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। বেদে সমাজ ভবঘুরে যাযাবর জীবনের শিকলে আবদ্ধ হয়ে দুর্বিষহ গতিধারার ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে। আদিকাল থেকে বেদে সমাজ রাজধানী, বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এদের বিচরণ। নদীমাতৃক দেশের সব নদীতে ছুটে বেড়ায় ওরা। নদী, খালের কিনার ঘেঁষে চোখে পড়ে বেদেনিদের নৌকার বহর। ঠিকানাবিহীন, অপরিচিত, অজানা, অচেনা ও সম্পূর্ণ অপরিচিত ঘাটে এসে নৌকা ভেড়ায়। আবার একদিন সেখান থেকেও উধাও। এভাবেই কাটছে ওদের দিন, মাস, বছর ও যুগ। কাটছে ওদের জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলো এবং তা অনেকটাই অনিশ্চিতভাবে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে,তাবিজ, কবজ বিক্রি, জাদু টোনা আর সাপ খেলা দেখিয়ে যাদের জীবন সংগ্রাম তারা আর কেউ নয় ছিন্নমূল অসহায় ও অধিকার বঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়। যাযাবর বেদেদের জীবন প্রণালী বড়ই বিচিত্র। রাস্তার পাশে, ফাঁকা মাঠে অথবা নদীর তীরে অতিথি পাখির মতো এদের আগমন ঘটে। আবার একদিন তারা উধাও হয়ে যায়, কেউ এদের খবর রখে না। কোথায় গেল? তার প্রমাণ মাঝে মাঝেই চোখে পরে। কোথা থেকে আসে আবার কোথায় চলে যাবে অজানা কোন এলাকায়।

তারা আজ এই এলাকায় কাল অন্য এলাকায় থেকে খুব ঝুঁকিপূর্ণ আদি পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। সাপ খেলা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেলে এ সম্প্রদায়ের অপমান হবে, এ ভেবে বংশ পরম্পরায় এ পেশা যে কোন মূল্যে ধরে রাখতে চায় তারা। কাক ডাকা ভোরে আলে না ফুটতেই তাদের পেশাগত কাজে ছুটতে হয় এক এলাকা থকে অন্য এলাকায়।

যতটুকু জানা যায়, উপার্জনের মৌসুম শেষ হলে বেদে পরিবারে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়েতেই তারা সবচেয়ে আনন্দ করে। তবে বেদেদের বিয়েতে আপ্যায়ন কিংবা উপহার প্রদানের কোনো নিয়ম নেই। সাধারণত বর-কনে একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করে। পছন্দের ব্যাপারটা তারা সেরে নেয় বিয়ের অনুষ্ঠানে। বেদেদের বিয়েতে বর-কনেসহ উপস্থিত সবাইকে নৃত্যগীত করতে হয়। বহিরাগত কেউ এলে তাকেও নাচতে হয়। এসব নাচ-গান একান্তই বেদে সম্প্রদায়ের। এ সময় অবিবাহিত মেয়েরা খুব আকর্ষণীয় সাজগোজ করে। অন্য যুবকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্য তুলে ধরে। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে এভাবেই তরুণ-তরুণীরা নিজেদের বিয়ের সঙ্গী খুঁজে নেয়। বেদেদের বিয়েতে বিশেষ কোনো ধর্মের রীতিনীতি নেই। বেদেদের বিয়ের আগে হবুবর একটি গাছে উঠে সবচেয়ে উঁচু ডালে গিয়ে বসে আর কনে দাঁড়িয়ে থাকে গাছের নিচে, কনে বরকে নেমে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বর নেমে আসে না। তখন সে বরকে প্রলোভন দেখাতে শুরু করে আমি তোমার সংসারের কাজ করব। শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করব। ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করব। বর নির্বিকার, সে উঁচু ডালে বসেই আছে নামার কোনো লক্ষণ নেই। কনে এবার বলে আমি তোমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করব না। তুমি যা বলবে তা শুনব।

শেষে যখন কনে বলে- তোমাকে আমার ভরণ-পোষণ করতে হবে না, বরং আমিই তোমাকে সারাজীবন রোজগার করে খাওয়াব, তখন বর গাছের মগডাল থেকে নেমে আসে- এরপর তাদের বিয়ে হয়। একাধিক বিয়ে এবং বাল্যবিয়ের প্রচলন এদের মধ্যেও আছে। বিয়ে করতে হলে কনেকে অর্থ দিতে হয়। যার যেমন সামর্থ্য, সে তা-ই দেয়। এ অর্থ বেদেনীর কাছে গচ্ছিত থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো কারণে ছাড়াছাড়ি হলে সম্পত্তি, ছেলেমেয়েও ভাগাভাগি হয়। সর্দাররা বিচার করে যা রায় দেয়, উভয়পক্ষকে তা মেনে নিতে হয়। বিয়ের রাতে স্বামীকে সন্তান পালনের জন্য প্রতিজ্ঞা করতে হয়। যতদিন স্ত্রী উপার্জনের জন্য বাইরে থাকে, ততদিন স্বামী-সন্তানের প্রতিপালন করে। বিয়ের পর স্বামীস্ত্রীর ঘরে যায়। স্ত্রীর ঘরই স্বামীর ঘর। বেদে নারীরা স্বামীদের আঁচলে বেঁধে রাখতে তুলনাহীন। পুরুষ বশে রাখতে তারা শরীরে সাপের চর্বি দিয়ে তৈরি তেল ব্যবহার করে। স্বামীর শরীরে তা নিয়মিত মালিশ করে। কোনো পুরুষের পক্ষে বেদে নারীর এই কৌশল উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। বেদে নারীর মায়ার জালে পড়লে তাকেও গোত্রের হয়ে থেকে যেতে হয়। তাছাড়া পুরুষকে ঘরে রাখার জন্য তারা তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ-কবজ করে। পুরুষ বেদে নারীর কাছে দেবতার মতো। সব ঝামেলা থেকে তারা স্বামীকে আগলে রাখে।

বৃষ্টির দিনে আয়ের সমস্যা আর শীতের দিনে পোশাক আর কম্বলের অভাব তাদের থেকেই যায়। শিশুরা পড়ালেখার সুযোগ পায় না। খাদ্য-বস্ত্রের অভাব লেগে থাকে ওদের জন্ম থেকেই। বেদেরা সাধারণত নৌকায় বাস করে। তাছাড়া জীবনের যাবতীয় কাজকর্ম এরা নৌকাতেই সেরে থাকে। নৌকাই সাধারণত তাদের আবাসস্থান, ঘরবসতি। নৌকায় ঘুরে বেড়ায় বলে নৌকাই তাদের জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির বদৌলতে এখন ভাসমান বেদে পল্লীর অনেক নৌকাতে একটি করে সোলার বিদ্যুৎ প্যানেল, টেলিভিশনসহ আধুনিক ছোয়া। বেদেরা আগের চেয়ে একটু উন্নত হয়েছে। এমনি অবস্থায় বেদে সম্প্রদায়ের অভাব ঘোচাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ। তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও দরকার। তবে এতে শুধু তারা নয়, সমাজ, দেশ উপকৃত হবে।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

 

"