সম্ভাবনা

যুবশক্তিই দেশের প্রধান সম্পদ

অলোক আচার্য্য

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

যুগে যুগে লেখক-কবিরা তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। তারুণ্য মানে নব জোয়ারে বিপুল শক্তি, তরুণ মানে নব উদ্যম। সব বাধা ক্লেশ দূর করতে যুবশক্তির বিকল্প কিছুই হতে পারে না। বুক ভরা একরাশ সাহস নিয়ে অধিকার চাইতে যে একবারও ভাবে না সে-ই তো তরুণ। তাই তো তারুণ্যের জয়গান করাই স্বাভাবিক। মানুষের জীবনের স্তরগুলোর মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক বা তরুণ, প্রৌঢ় এবং বৃদ্ধ। এর মধ্যে তরুণ সময়টা অনেক বেশি পাওয়া যায়। আর এ সময়ের মধ্যে আমাদের অনেক কাজ করতে হয়। বলতে গেলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সিদ্ধান্ত এই সময়েই নিতে হয়। কারণ এই কাজের ওপর ভবিষ্যতের পথ নির্দেশিত হয়। ধরা যাক, কেউ যদি আরাম আয়েশে এ সময়টি পার করে দিল। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ কী হবে? তা যে অনেক কঠিন হবে তা বলাই যায়। যুবক বয়সে পরিশ্রম করতে হয়, জীবন নামক যুদ্ধের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়। কারণ একটা বয়সে এসে শরীর তার শক্তি হারাতে থাকে। কর্মশক্তি কমতে থাকে। সেই সঙ্গে মনের জোরেও ঘাটতি দেখা দেয়। যদিও জীবন মানেই সংগ্রাম, আর এই সংগ্রামের উপযুক্ত সময় হলো তারুণ্য। বৃদ্ধ বয়সে মনের জোর থাকলেও শরীর তখন নানা জরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তাই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি বৃদ্ধ বয়সে খুব কম মানুষেরই থাকে। তাই যা কিছুই অর্জন করি না কেন তার সিংহভাগের দাবিদার তারুণ্য। আর এজন্য দেশের যুবসমাজ হলো দেশের প্রাণশক্তি। যুব সমাজ যত বেশি দক্ষ হবে দেশ তত সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হবে।

ইতিহাস লিখে যান বয়স্করা, কিন্তু তা তৈরি করেন তরুণরা। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তির আন্দোলনে সর্বপ্রথম যুব সমাজই প্রত্যক্ষ সমরে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে। কামানের সামনে নির্দ্বিধায় দাঁড়িয়ে বলেছেÑস্বাধীনতা চাই, মুক্তি চাই। অধিকার আদায়ে সদা সর্বদা দৃঢ় মনোভাব পোষণ করেছে এই যুব সমাজ। ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ব্রিটিশদের অধীনে থেকে নিষ্পেষিত হচ্ছিল সেসময় থেকে আরম্ভ করে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া, স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদÑএসব আন্দোলন, সংগ্রামে যুবসমাজের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ওরাই যে দেশের প্রাণ ভোমরা। প্রতিটি হাত একেকটি দেশ গড়ার হাতিয়ার। তরুণদের চোখে থাকে স্বপ্ন। বুকে থাকে আশা। ওরা স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্ন দেখায়। যা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সমাজকে পরিবর্তন করে। বিশ্ব দরবারে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। যারা বয়োজ্যেষ্ঠ তাদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব তুলে নেয় যুব সমাজ।

মাস্টারদা সূর্যসেন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনারা এবং স্বৈরাচার শাসকের বিরুদ্ধে বুকে পিঠে স্লোগান লিখে রাস্তায় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়া সবাই তরুণ। এরা সবাই দেশের কল্যাণে, মানবতার কল্যাণে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে এক মুহূর্ত ভাবেনি। মধ্যপ্রাচ্যর দিকে তাকালেও আমরা তরুণদের জয়গান শুনতে পাই। মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তে মূল ভূমিকা রেখেছিল তরুণ বা যুবসমাজই। আমেরিকা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন আন্দোলনেরও অগ্রবাহিনী এই তরুণরা।

১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার রেসপন্সিবল ফর ইয়থ-এ ১২ আগস্টকে বিশ্ব যুব দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তী বছর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিনটিকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিশ্বে আগস্ট মাসের ১২ তারিখ যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। যুব সম্প্রদায়ের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য সারা বিশ্বে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও যুব সম্প্রদায়ের মেধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুবকদের কারিগরি বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উল্লেখযোগ্য। যার মূল লক্ষই হলো যুব সম্প্রদায়ের হাত দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশের উন্নয়নে অবদান নিশ্চিত করা। আমাদের দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশই যুবসমাজ।

জাতীয় যুব নীতিমালা অনুসারে ১৮ বছর থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত বয়সীদের যুব বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হিসেবে জনসংখ্যার বেশিরভাগই যুবসমাজ। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে যৌবনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ণড়ঁঃয রং ঃযব ড়ভ ষরভব যিবহ ধ ঢ়বৎংড়হ রং ুড়ঁহম. ঊংঢ়বপরধষষু ঃযব ঃরসব নবভড়ৎব ধ পযরষফ নব পড়সবং ধং ধফঁষঃ: ঃযব যধফ নববহ ধ ঃধষবহঃবফ সঁংরপরধহ রহ ঃযরং ুড়ঁঃয. ঞযব য়ঁধষরঃু ড়ৎ ংঃধঃব নবরহম ুড়ঁহম.

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বর্তমান যুবসমাজের একটি অংশ আজ দিধাগ্রস্ত। নানা কারণে তারা বিভক্ত, হতাশাগ্রস্ত। এই অবস্থার পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে সর্বনাশা মাদকের গ্রাস। এছাড়া ইন্টারনেটের অপব্যবহার করছে তারা। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে চাকরি না মেলায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি নিতে মাদকে আসক্ত হচ্ছে। মাদক আমাদের যুব সমাজকে গ্রাস করছে। খুব ধীরে ধীরে আমাদের যুবক-যুবতীরা মাদকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যার ভয়াল ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের মেধা আমাদের ভবিষ্যৎ।

যুবকরা জীবনযুদ্ধের জন্য যোগ্য। এ যুদ্ধের ময়দানে হার না মানা যৌবনেরই। যৌবনের শক্তি প্রচ-, গতি তার দুর্বার। তা যেমন পাহাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি প্রবল দুর্যোগে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে সেবার হাত বাড়াতে পারে। এ এমন এক শক্তি যার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশ, জাতি উন্নতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছাবে। যুবকরা নিজে শিখবে এবং অন্যদের শেখাবে। আজ যারা কিশোর তারা কদিন পরেই যৌবনে পদার্পণ করবে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে দায়িত্ব। সেটা যেমন নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি, তেমনি সমাজ ও দেশের প্রতিও সমান দায়িত্ব রয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুবশক্তির বিকল্প নেই। তাই যুবশক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে। সৃষ্টিশীল কাজে তরুণদের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। তাদের ভেতরকার মেধাকে বাইরে এনে তা ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। দেশ প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে তরুণ সমাজের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে ওরা পিছিয়ে পড়লে দেশ পিছিয়ে পড়বে। এতে কেউ লাভবান হবে না। বরং যুবসমাজের প্রতিটি হাতের কাজের নিশ্চয়তা বিধান করাতেই সবার মঙ্গল।

লেখক : শিক্ষক, পশ্চিম বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাবনা

"