অনুবাদ

ভারতে গরুপ্রেম

শশি থারুর

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই স্তম্ভিত করছে আর ভীতিকর হয়ে উঠছে। গরু রক্ষার যে জোয়ার এত পর হলেও ফেঁপে উঠেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বে তা ভারতীয় সংস্কৃতিতে আগে থেকেই ছিলÑ এবং এটা অনাকাঙিক্ষতও নয়।

অনেক সনাতন হিন্দু, বশেষত উত্তর ভারতের কিছু রাজ্য আছে যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছে বহুলকথিত গরুর এলাকা সেখানকার বাসিন্দারা গরুকে গো-মাতা হিসেবে পূজা করে থাকে, এবং এই মাতা ‘সবার মাতা’, যার কাছ থেকে পাওয়া যায় শরীরের যতœ ও পুষ্টিÑ তবে তা দুধ থেকে মাংস থেকে নয়।

এখানে ব্যক্তিগত পছন্দের বালাই নাই। অনেক ভারতীয় রাজ্য আইন করে গরু জবাই নিষিদ্ধ করেছে এবং কেউ কেউ গরুর মাংস সংরক্ষণ অথবা খাওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ করেছে। গরু জবাই এবং এর মাংস খাওয়া ভারতের ২৯ রাজ্যের মধ্যে দক্ষিণ এবং উত্তরপূর্বের মাত্র পাঁচটিতে বৈধ।

অতীতে আমরা দেখেছি গরু রক্ষা আইনের প্রয়োগ খুব একটা ছিল না, অন্তত পুলিশের তখন মানুষের বাড়ির রান্নঘর ঘুটে বেড়ানোর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সাধারণ ভোটে ক্ষমতায় আসার পর ধর্মের জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়ল গোটা ভারতজুড়ে, তারা শুধু নতুন করে গরু রক্ষার আইনই তৈরি করল না তাদের বিভিন্ন বিধিনিষেধ পালনের কড়াকড়িও আরোপ করতে থাকল। ‘গরু রক্ষা সমিতি’ নতুন করে জাগ্রত হলো আর তাদের সদস্যরা নিজ হাতেই তদারকির দায়িত্ব নিয়ে নিলেন কোথাও যেন গরু জবাই না হয় অথবা এর মাংস খাওয়া না হয়।

পরিস্থিতি এর ফলে খারাপের দিকেই গেছে, গরু রক্ষার এই আয়োজন ভারতীয় সমাজকে যুক্ত করেছে ধারাবাহিক এক ধ্বংসাত্মক প্রথার সঙ্গে, যার কারণে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন মুসলিম এবং দলিতরা ( যাদের অচ্ছুত বলা হয়)। বস্তুত এসব গরুর এলাকায়, যেখানে গরুর প্রতি দায়িত্বশীলরা অধিক সহিংস সেখানেই দলিতরা বেশি নিগৃহিত হচ্ছে। উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থানÑ এই চার রাজ্যে ৬৩ ভাগ দলিতের বাস। এটা বলাও অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এই চার রাজ্যে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করেছে।

গরু ও দলিতের সম্পর্ক বিষয়টিও সুপরিচিত। গরুকে পবিত্র বিবেচনা করা হলেও তারা অমর নয়, তারা যখন মারা যাবে (স্বভাবতই সে মৃত্যু হবে প্রাকৃতিক), কাউকে না কাউকে তো তাদের মৃতদেহ সৎকার করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে দলিতদের ঘাড়েই এই দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যারা গরুর মরদেহ সংগ্রহ করে, তাদের চামড়া ছাড়িয়ে নেয় এবং ট্যানারি অথবা চামড়া-ব্যাসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করে থাকে আর মাংস দেয় মুসলমান কসাইদের (যদি বৈধতা থাকে) আর শরীরের বাকি অংশ তারা হয় দাহ করে নয়ত কবর দেয়। এটা কিছু অর্থনৈতিক সুবিধাসহ বেঁচে থাকার এক ধরনের ব্যবস্থাÑ যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরও রেহাই দেয় কারণ তারা এমন কাজ করতে চায় না।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই ব্যবস্থার মূলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গুজরাটে, চার দলিত যুবককে ধরা হলো মৃত গরুর চামড়া আলাদা করা সময়, তাদের নগ্ন করে, বেঁধে লোহার রড দিয়ে পেটানো হলো গরুর রক্ষরকদের দ্বারা, আর তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিল প্রাণী হত্যার (আসলে তারা এজন্য দায়ী নয়)। বিজেপি-শাসিত মধ্য প্রদেশেও দেখা গেল দুই দলিত নারীকে নির্যাতন করা হলো অবৈধ গরুর মাংস বহনের সন্দেহ থেকে ( যদিও মহিষর মাংস বহন সেখানে বৈধ)। পাঞ্জাবে দুই তরুণ দলিতকে মারা হলো এবং তাদের শরীরে পস্রাব করা হলো সেই একই ‘অপরাধে’। এক ১৬ বছর বয়সী কাশ্মিরী কিশোরকে হত্যা করা হলো গরু বহনকারী ট্রাকে নাচানাচি করার অপরাধে।

চলমান পরিস্থিতি অস্থিরতার আশংকাকে বাড়িয়ে তুলছে তাদের মনে যারা এভাবে গরু প্রতি অতিশোয়াক্তিতে সাড়া দিতে পারছেন না। এই দল কিছু কিছু পক্ষের জন্য গুরুতর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ডেকে আনছেন।

যেসব চাষি তাদের গরুকে যতœ দিয়ে বড় করেন তাদের পক্ষে সেসব বুড়ো এবং দুধ দিতে অক্ষম হয়ে পড়লে আর লালন-পালন সম্ভব হয় না। এর আগে তারা হয়ত এই সমস্যা থেকে উৎরে যেতে কসাই অথবা যেসব দেশে গরু জবাই বৈধ সেসব দেশে রফতানির জন্য তা বিক্রি করত। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা বিপদজনক, অনেক চাষি বৃদ্ধ গরু পুষতে গিয়ে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, অন্যদিকে ভারতে গরুর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বগজনক হারে।

উপরন্তু দলিত জনতাও গরুর মরদেহ সৎকারের আয়োজন থেকে বিরত থাকতে চাইছে। গুজরাটের ঘটনার পর দলিতদের একটি পক্ষ তাদের ওই রাজ্যে আহুত তাদের বিক্ষোভে তাদের এই উদ্দেশ্যের কথা জানিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, যদি তোমরা গরুকে মা মানো তাহলে তার সৎকার করতে চাও না কেন?

যখন এসব ঘটছিল তখন কেন্দ্রীয় সরকার কী করছিল? তারা সরাসরি গরু রক্ষকদের দোষারোপ করেনি। ভারতের সমাজকল্যাণমন্ত্রী, যার দায়িত্ব দলিতদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের কল্যাণে কাজ করা, শুধু গরুর রক্ষকদের সহিংস কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমা চাওয়া নয় তার উচিত এটাও বলা যে গুজব রটিয়ে হীন উদ্দেশ্যে তাদের উপর হামলা চালানো হয়েছে।

সরকারের একই অবস্থা দেখা গেছে উত্তরপ্রদেশের ঘটনায়ও, যেখানে একদল লোক সংঘবন্ধ হয়ে এক মুসলিম এবং তার সন্তান প্রায় মেরেই ফেলেছিল, নিছক তারা গরু জবাই করেছে এই সন্দেহ থেকে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পক্ষে না দাঁড়িয়ে সরকারে সেখানে তদন্তকারী দল পাঠাল আসলেই তাদের ফ্রিজে গরুর মাংস আছে কিনা তার ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য (এবং তা ছিলও না)। তাদের দিক থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি এখন পরিষ্কার, সন্ত্রাস তখনই অসমর্থনীয় যখন এমন কারুর উপর হামলা করা হবে যারা গরু হত্যা করবে না অথবা এর মাংস খাবে না।

গত ৬ আগস্ট এই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার নীবতা ভাঙেন অবশেষে, তিনি জনসাধারণক সাবধান করে দেন ভুয়া গরু রক্ষকদের বিষয়ে যারা সামাজিক বিরোধ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘সব রাজ্যের উচিত এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’ মোদির বক্তব্য অবশ্যই তাদের জন্য স্বস্তির যারা ভাবছিলেন সরকারের সহানুভূতি তাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা। যদিও গরু রক্ষার এই আয়োজন থেকে মুক্তি পেতে ভারতের অনেক সময় লাগবে। যদি দলিতরা চায় ভারতজুড়ে গরুর শবদেহ পঁচতে থাকুক, সম্ভবত দুর্গন্ধই হবে তখন প্রাপ্তি। এভাবে যদি হিন্দু উগ্রবাদ বাড়তে থাকে তাহলে ভারতীয়দের জন্য নাকে হাত দিয়ে চলাফেরার যথেষ্ট কারণ তৈরি হবে বৈকি।

শশি থারুর : সাংসদ, ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ সালাহ উদ্দিন শুভ্র

"