বন্যা

ত্রাণ বিতরণ বিষয়ে

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

বন্যা, জলোচ্ছ্বাস আমাদের নিত্য সঙ্গী। কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের রাহুগ্রাস এদেশের মানুষের ললাটে যেমন লেগে রয়েছে তেমনি প্রতিবেশী ভারত আন্তর্জাতিক নদীনীতি (নদী আইন) হেলসিঙ্কি নীতিমালা না মানার কারণে এবং বর্ষাকালে অসময়ে উজানের পানি আসায় দেশ যেমন পানিতে সয়লাব হচ্ছে তেমনি শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ও দেশের ছোট বড় ৪২টি নদীর উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে দেশের কৃষি খাতকে সমূলে ধ্বংসের অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্য সম্পদ ও নদীর নাব্যতা।

বন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা রোগে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাদের চিকিৎসায় ৩৪৬টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৪ জন মৃত্যুবরণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, এ নিবন্ধটি লেখার সময় পর্যন্ত দেশের উত্তরাঞ্চলের ১০টি জেলার ৫৬টি উপজেলার ২০৪ টি ইউনিয়নে ৩ হাজার ২২ জন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানা যায়। বন্যা সতর্কীকরণ (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, ধরলা, আত্রাই, শীতলক্ষ্যা, কালিগঙ্গা ও কংসসহ ১৩টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবর জানা গেলেও এ লেখার সময় জানা যায় এরই মধ্যে ৩-৪টি নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকের সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, জামালপুরের বকসীগঞ্জের মেরুরচর, ফকিরপাড়ার বন্যার্তরা গত ত্রাণের অপেক্ষায় আছে। অর্ধাহারে অনাহারে দিন যাপনরত বানভাসিরা কোনো নৌকা দেখলেই ছুটে আসছে। অনেক নারী-পুরুষ ঘন্টার পর ঘন্টা পানিতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একমুষ্ঠি ত্রাণের (জিআর) আশায়। এসব এলাকায় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মনিটরিং সেল খোলা হলেও, বন্যার্তরা ত্রাণ পাচ্ছে না বলে জানা যায়।

বন্যায় দুর্যোগকবলিত বানে ভাসা মানুষদের এই দুর্ভোগের মধ্যেও সরকারি (জিআর) রিলিফের অনিয়ম থেমে থাকেনি। গত ২ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার ৫টি উপজেলার ১০ ইউনিয়নে দু-দফায় বরাদ্দকৃত ২০৫ টন (জিআর) রিলিফের চাল অনিয়ম হয়। যার সরকারী মূল্য ৬৫ লাখ টাকা। তাতে মানা হয়নি মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা। রিলিফ (জিআর) বন্টনে ৫টি শর্তযুক্ত পরিপত্র থাকলেও তা মানা হয়নি। শর্তগুলো হচ্ছেÑক) মানবিক সহয়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন ২০১২-১৩ অনুসরণপূর্বক ব্যয় নিশ্চিতকরণ খ) প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে অবহিতকরণ, গ) বরাদ্দপ্রাপ্ত ইউএনওরা নিজ নিজ ওয়েবসাইটে বরাদ্দপত্র আপলোডকরন, ঘ) বরাদ্দকৃত (জিআর) চাউল, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ৩ কেজি হারে ট্যাগ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বিতরণকরণ, ঙ) নিরীক্ষার জন্য যাবতীয় কাগজপত্র (রিলিভেন্ট পেপার) সংরক্ষণ।

কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন সমন্বয় কমিটির সদস্য হিসেবে ৮৮ সালের বন্যার সময় সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে ভাটি এলাকার বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময় কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও ময়মনসিংহ সেনাবাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ, সেবা, সততা ও মানুষের জন্য মানুষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা কোনো দিন ভুলে যাওয়ার নয়। এ দেশের মানুষ ঘুরেফিরে প্রতিবছর সর্বনাশা বন্যা ও খরার করাল গ্রাসে নিপতিত হয়ে থাকে। এই মহাসঙ্কট থেকে পরিত্রাণের নিরিখে ভারত, বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে নদী সমস্যার সমাধানে বছরের পর বছর আলোচনার সময় নষ্ট না করে চীন, নেপালকে সমন্বয়সহ প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় এর আশু সমাধান হতে পারে বলে অনেকেরই ধারণা। সমস্যা জিইয়ে রাখার চেয়ে সমাধানের লক্ষ্যে এগিয়ে চলাই আমাদের পাথেয়। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবেই সাম্য নিবিড় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। তাছাড়া বাংলাদেশের কৃষ্টি, সভ্যতা ও সম্প্রীতির আলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিরপেক্ষ ও উদার। বিদেশে বাংলাদেশের অগণিত বন্ধু ও হিতাকাক্সক্ষী থাকলেও প্রভু নেই। বাংলাদেশের আন্তঃনদী সমস্যা সমাধানে চীন, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ফোরামসহ বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের উদ্যোগই আশার আলো জাগাতে পারে। এ দেশের মানুষকে বন্যা, খরার হাত থেকে বাঁচানোর এটাই স্থায়ী সমাধান বলে দেশের সুশীল সমাজ ও সচেতন জনগণের ভাবনা।

 

লেখক : কলামিস্ট

"