অনুবাদ

রাশিয়া ও তুরস্ক কী দেবে সিরিয়াকে

নিউইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের দুই প্রধান প্রতিপক্ষ। পুতিন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন, অন্যদিকে এরদোয়ান আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তার বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

এই দুই ব্যক্তি যখন গত মঙ্গলবার তাদের ৯ মাসব্যাপী চলমান রক্তক্ষয়ী বিরোধিতাকে পেছনে রেখে সেন্ট পিটার্সবুর্গে সাক্ষাৎ করলেন, তখন একটি প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক যে, তারা কি সেই সংঘাতের সমাপ্তির দিকে যাচ্ছেনÑযা ৪ লাখ ৭০ হাজার সিরিয়ানের মৃত্যু এবং লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। সিরিয়ার জন্য বেদনাদায়ক হলেও সত্য, উত্তরটি নেতিবাচক।

তাদের সেই বৈঠকের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই পক্ষেরই ঐকমত্য রয়েছে সিরিয়ায় প্রয়োজনে ‘যুদ্ধ বিরতি’ ঘোষণা, মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া এবং সংকটের সমাপ্তি ঘটাতে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে। কিন্তু তার বক্তব্যে যে মৌলিক বিরোধ দুই পক্ষে রয়েছে তা কমিয়ে আনার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা হাজির নেই। তুরস্কপন্থী বিদ্রোহীদের ওপর রাশিয়া কি বোমাবর্ষণ করেই যাবে, অথবা আসাদপন্থীদেরও একই পরিণতি বিষয়ে তাদের ভাবনা জানা যায়নি। সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এসব কারণে অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

বর্তমানে সবার চোখ আলেপ্পোর দিকে, যা পাঁচ বছর আগের এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ছিল সিরিয়ার সবচেয়ে বড় শহর এবং এখন সরকারপন্থী এবং বিরোধীদের দখলে দুই ভাগ হয়ে আছে। প্রেসিডেন্ট আসাদের সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ার জোট আলেপ্পোর বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্বাংশে অবস্থিত শহরে প্রবেশের শেষ পথটিও বন্ধ করে দিয়েছে গত জুলাইয়ে। এরপর সপ্তাহান্তে বিদ্রোহী জিহাদিদের জোট যারা নুসরা ফ্রন্ট নামে পরিচিত এবং যারা আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়, তারা মাসাধিককালের যুদ্ধ বিরতি ভঙ্গ করলে সেখানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের তৎপরতা আসাদ বাহিনীকে বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে আকাশপথে লাগাতার বোমাবর্ষণে উৎসাহ জুগিয়েছে যেন। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য মতে, ২০ লাখ মানুষ এর ফলে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে এবং পানি, খাদ্য এবং চিকিৎসাসামগ্রী তাদের এই মুহূর্তে অত্যাবশ্যকীয়। এই অবস্থায় বিদ্রোহীরা তাদের দখলে থাকা অংশ ধরে রাখতে পারবে কি না তা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

গত বুধবার রাশিয়া বিদ্রোহী এলাকায় বোমাবর্ষণযজ্ঞে অংশ নিয়েছে এবং বলেছে আলেপ্পোয় ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টা যুদ্ধ বিরতি দেওয়া হবে, যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সময়ে সব ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে চাতুরী কিন্তু অব্যাহতই থাকছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন সবসময় একজন অস্বচ্ছ সঙ্গী, তিনি বারবার তার ওয়াদা পূরণে ব্যর্থ হন।

গত সোমবার আলেপ্পোর আহত ও রুগ্ণ শিশুদের চিকিৎসা শেষে ফিরে আসা দুই মার্কিন চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিবেদন দেখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে প্রস্তাবনা দিয়েছে তা সেখানকার করুণ পরিস্থিতিকে নতুন করে সবার সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও রাশিয়ার কূটনীতিক সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রতিবেদনকে অপপ্রচার বলে উল্লেখ করে এবং একে তারা ‘সিরিয়া পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে বাধা’ বলে উল্লেখ করে।

নিরাপত্তা পরিষদের উদ্দেশ্য একটি আসাদপন্থী এবং বিদ্রোহীদের নিয়ে জোট সরকার গঠনÑযা সবার সম্মতিতে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে এবং আসাদকে ক্ষমতা ছাড়ার একটি সহজ পথ খুঁজে দেবে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ সাফল্য না পাওয়ার ফল স্বরূপ সেখানে নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, যুদ্ধ থামানোর বিষয়েও উন্নতি দেখা যায়নি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া আবারো একমত হওয়ার চেষ্টা করছে একটি চুক্তির মাধ্যমে, যেখানে থাকবে কীভাবে সিরিয়াকে তার বিদ্রোহীদের ওপর বোমাবর্ষণ বন্ধ করানো যায়, যুদ্ধ বিরতি আনা যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে সেখানে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে কীভাবে আইএস এবং নুসরা ফ্রন্ট অধীন এলাকায় বোমা ফেলা অব্যাহত রাখা যায়। কিছু মার্কিন বিশেষজ্ঞের মতে, নিজেদের সংগৃহীত তথ্য ও পরিকল্পনা বিনিময় নুসরা ফ্রন্টকে নতুন এলাকা দখল থেকে বিরত রাখবে।

যদিও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উত্তরোত্তর সমর্থন জানাচ্ছেন, তবে তিনি আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নারাজ এবং তিনি সেখানে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে চান যতক্ষণ না তার বাহিনী কার্যালয় দখলে সফল হয়। যদিও রিপাবলিকান মনোনীত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিন্তু ডেমোক্র্যাটিক মনোনীত প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন আরো সামরিক বাহিনী সেখানে পাঠানোর বিষয়ে মত দিয়েছেন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তায় ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবিও জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের এ বিষয়ে আরো মনোযোগী হতে হবে যে, তাদের নেতারা কী বলছেন। তবে এই অচলাবস্থার অবসানের একমাত্র আশা সব পক্ষের একমতে পৌঁছানোর উদ্যোগের মধ্য দিয়েই পাওয়া যেতে পারে।

 

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

"