সমাজ

মনের গভীরের যন্ত্রণা থেকে

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সংবাদ পড়ে জানলাম একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বাসা থেকে নির্যাতিত এক কাজের মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বীথি নামে কাজের মেয়েটির ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে। বলা হচ্ছে গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী বীথির ওপর বর্বরের মতো এতটাই নির্যাতন চালিয়েছেন যে, যা অনেকের পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করাই সম্ভব নয়। শিশুটির শরীরে নাকি ঢালা হয়েছে গরম ভাতের মাড় এবং দেওয়া হয়েছে খুন্তির ছেঁকা। এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদে বিচারের দাবিতে মানুষ মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। সমাবেশে কান্না জড়িত কণ্ঠে অনেকেই বলেছেন, অত্যাচারিত এই শিশুকে দেখলে মনে হবে দুর্ভিক্ষ পীড়িত আফ্রিকার কোনো অঞ্চলের কংকালসার মানব শিশু।

এখন কথা হচ্ছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করে সমাজের শান্তি বিনষ্টকারীদের শাস্তি দেওয়া, সেখানে তার নিজের বাসায় অসহায় একটা মেয়েকে প্রতিনিয়ত নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এসব দেখে বলা যায়, কে কার বিচার করবে। কেননা বিচারক যদি অপরাধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তা হলে তো জীবন নাটকের স্বাভাবিক দৃশ্যাবলি অন্যরকম হতে বাধ্য। আমাদের দেশের গরিব ঘরের মেয়েরা একমুঠো ভাতের জন্য যে বয়সে তার পড়াশোনা করার কথা, সেই বয়সে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করতে যায়। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে এক শ্রেণির নতুন ভদ্রলোক এসব অসহায় মানুষের সন্তানের ওপর এমন নির্যাতন চালায়, যা কখনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মূল কথা হচ্ছে, এখনো আমাদের চৈতন্যের মধ্যে এই সত্যটা প্রকাশ পায়নি যে, প্রত্যেকটা মানুষেরই তার মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রাখে। মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার এই মৌলিক অধিকার মানুষের জন্মগত। সেই অধিকার মানুষকে দিয়েছে সুশীল সমাজের রীতিনীতি এবং একটা কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। একজন সরকারি কর্মকর্তা কিংবা এই স্তরের মানুষজন তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়বিচারের পরিধি বিস্তৃত করতে না পারলে, সমাজের আর দশজন মানুষ তা করবে কী করে। আবার এমন কথাও বলা যায় যে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পরিবারে বা তার আশেপাশের মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ কিংবা নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা ছড়াতে না পারেন, তা হলে তো কখনো সম্ভব হবে না তার পক্ষে কোর্ট কাচারীতে ন্যায়বিচার সম্পন্ন করা। অসহায় শিশুর ওপর অত্যাচারের যে কাহিনি আমরা জানলাম, তা শুনে আমরা এতটুকুই বলতে পারি, আমরা এখনো সভ্য সমাজে বসবাস করার মতো মানুষ হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারিনি। আমরা এখনো সভ্যতার আলোকরাশি থেকে অনেক অনেক দূরে রয়ে গেছি। আজ আমরা যতই চিৎকার করে বলি না কেন, আমরা সকল নীতিনৈতিকতা মেনে চলি, বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা এখনো চরম বর্বরতাকে আশ্রয় করে বেঁচে আছি। পত্র-পত্রিকা পড়ে মনে হলো অসহায় শিশু বীথির ওপর যে অত্যাচার হয়েছে তার বিচারের দাবিতে মানুষ জেগে উঠেছে। আবার এমন কথাও শোনা গেছে, যার ওপর অভিযোগ করা হয়েছে, সেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাকে বিচারিক ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় অর্থাৎ কাজের মেয়ের ওপর অত্যাচারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিচারককে হয়ত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মানুষ যদি জেগে থাকে তাহলেই সম্ভব হবে এই অন্যায়ের বিচার করা। এছাড়া অন্যরা যারা অসহায় শিশুটিকে অত্যাচার করেছে তাদেরও শাস্তি হতে পারে। কিন্তু এখানে বড় হয়ে যা দেখা দিচ্ছে, তা হলো আমরা আজ কোন সভ্যতার ছায়াঘেরা বিবর্ণ প্রান্তরে বসবাস করছি। আমাদের পায়ের তলার মাটি কি আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে? নাকি সেখানে কেউ কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে? আমরা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা অংশ কি একেবারে বিবেকহীন হয়ে পড়েছি। মানবিক মূল্যবোধ থেকে আমরা যেন যোজন যোজন দূরত্বে বসবাস করছি। যার জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তা একটা শিশুর ওপর নির্যাতন করতে দ্বিধাবোধ করেন না। আবার তিনি যদি বলেন আমি কিছু করিনি, তাহলে বলতে হবে তিনি কোন অন্ধকারে বসবাস করেন। যেখানে বীথির মতো অবুঝ শিশুকে নির্যাতিত হতে দেখেন না কিংবা বলা যায় একটা শিশুকে নির্যাতিত হতে দেখেও নিশ্চুপ থাকেন। এমন প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আমাদের সমাজের নতুন ভদ্রলোকেরাই দিতে পারবেন।

লেখক : আইনজীবী

"