পর্যবেক্ষণ

ভাষা বিষয়ে আমাদের অনীহা ও স্ববিরোধিতা

আহমদ রফিক

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

দেশ বিভাগ, বঙ্গ বিভাগের (১৯৪৭) পর পূর্ববঙ্গ (পরে পূর্ব পাকিস্তান) নামে যে ভূখ- পূর্বাঞ্চলের বাঙালিদের জন্য বাসভূমি-মাতৃভূমি হয়ে ওঠে, সেখানে ছিল ব্যাপক মুসলমান-প্রাধান্য। আর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মবিশ্বাসীদের সংখ্যা ছিল কম। সে ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে প্রথমোক্তদের প্রাধান্য থাকবেÑএটাই স্বাভাবিক।

এ বাস্তবতায় একটি অদ্ভুত স্ববিরোধিতার প্রকাশ দেখতে পাই বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক চেতনা ও তৎপরতার মধ্যে। এটা সচেতন না অসচেতন অবস্থার দান, তা নিয়ে গবেষণার অবকাশ রয়েছে। আরো বিস্ময়কর হলো, এ ঘটনা শুধু একবার নয় ইতিহাসের ধারায় একাধিকবার ঘটেছে। বিশেষভাবে ভাষা চেতনা ও জাতিসত্তা বনাম ধর্মীয় চেতনা এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ নিয়ে।

বিগত শতকের চল্লিশের দশকের শুরু থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গীয় মুসলমান জিন্নাহ প্রচারিত দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রভাবে তার ভাষিক জাতিসত্তাকে ভুলে বা একপাশে সরিয়ে ধর্মীয় চেতনা ও ধর্মীয় সত্তাকে প্রধান বিবেচনা করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক উন্মাদনার প্রকাশ ঘটায়। হাতেগোনা সামান্য কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠী ওই উন্মাদনার ব্যতিক্রম। অবশ্যই সেই উন্মাদনার নেপথ্যে সম্প্রদায়গত আর্থ-সামাজিক বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

মূলত সেসব কারণের প্রেক্ষাপটে স্বপ্নের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তিন-চার মাসের মধ্যেই স্বপ্নভঙ্গ শুরু প্রধানত ছাত্রসমাজে। তবে প্রাথমিক কারণ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৭ সালের ভাষা-বিক্ষোভ পেরিয়ে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত সরকারি নীতিবিরোধী ভাষা আন্দোলন। সে ধারাবাহিকতা একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের প্রতিবাদে অব্যাহত।

এ আন্দোলনে বাঙালি মুসলমান সন্তানরা প্রধান চালিকাশক্তি হলেও তাদের সঙ্গে তৎপর হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান অর্থাৎ বাঙালি জাতির তরুণসমাজ আন্দোলনের কারিগর। মাতৃভাষার অধিকারের সঙ্গে জাতি, জাতীয়তার অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিরও ছিল প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি। বায়ান্নতে বিশেষভাবে ছাত্র আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত। প্রতিবাদী জনশক্তি তখন রাজনৈতিক বিচারে ধর্মীয় চেতনা সম্পর্কে সচেতন না হয়েই ভাষিক চেতনার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সচেতন। তা না হলে পোস্টকার্ড-এনভেলপাদিতে ইংরেজি-উর্দুর পাশে বাংলা না থাকায় নীলক্ষেত ব্যারাকের বাসিন্দা সরকারি কর্মচারীরা ক্ষেপে উঠবেন কেন?

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম সংবিধান প্রণয়নের সুবাদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও আর্থ-সামাজিক অঙ্গনে অবাঙালি-অধ্যুষিত পশ্চিম পাকিস্তানের বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানের পিছু হাঁটা বন্ধ হয়নি। দুই পাকিস্তানের মধ্যে সর্বমাত্রিক বিরূপতা, অবজ্ঞা, অবহেলা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিক্রিয়ায় সাতচল্লিশের বাঙালি মুসলমানসহ তাদের উত্তরসূরি সম্প্রদায়-নির্বিশেষে অধিকাংশ বাঙালি জাতিসত্তার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে শামিল হয়। এর প্রকাশ বাঙালি জাতি চেতনার, যেমন সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায়, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। বহিরঙ্গে বাঙালিয়ানার ব্যাপক উদ্ভাস আপাতদৃষ্টে প্রবল আবেগের জন্ম দেয়। সংস্কৃতিক্ষেত্রে এর প্রকাশ সর্বাধিক। যেমন ভাষার ব্যবহারে, তেমনি পোশাক-পরিচ্ছদে, আচার-অনুষ্ঠানে (পয়লা বৈশাখ), সাহিত্য সম্মেলনে ও সাহিত্য সৃষ্টির মতো তৎপরতায়।

পঞ্চাশের দশক যদি হয়ে থাকে ভাষা চেতনার, তো ষাটের দশক জাতীয়তাবাদী চেতনার, অন্য ভাষায় ভাষিক জাতীয়তার মুক্তির দশক হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। এর গুরুত্ব সমধিক এ কারণে যে, একই সঙ্গে প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, গণসংস্কৃতির প্রকাশ ঘটিয়ে ভাষিক জাতীয়তার চেতনাকেও ধারণ করেছে জনগণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দীপনায়। এর জোয়ারি প্রকাশ ঘটেছে ঊনসত্তরের গণজাগরণে, বিশেষ করে ২০ জানুয়ারি আইয়ুববিরোধী প্রতিবাদী মিছিল পরিচালনায় গুলিবিদ্ধ আসাদের মৃত্যু, যা শেষ পর্যন্ত এক ইতিহাস। শহীদ আসাদ এখন এক প্রতিবাদী কিংবদন্তি।

আবারো ছাত্রদের আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। সঙ্গে আরেক ইস্যুÑআগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তদের মুক্তি দাবি, যা কারফিউ-১৪৪ ধারাকে দলিতমথিত করে ছাত্র-জনতা বনাম চ- শাসকনীতির সংঘাতে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় স্বৈরতন্ত্রী শাসকগোষ্ঠীকে। পরিণামে প্রতাপশালী আইয়ুবশাহীর পতন এবং নয়া সামরিকতন্ত্র ক্ষমতায় আসীন হয়। ষড়যন্ত্রে, চক্রান্তে, দূষিত কূটনীতিতে পারদর্শী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একাত্তরে শেষ বর্বরতার প্রকাশ ঘটিয়েও একচেটিয়া শাসনক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ক্ষমতাসীনদের পতনসহ বিখ-িত পাকিস্তান, জন্ম রক্তাক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

কথাটা সবাই বলে থাকেন : বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ মানুষ দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভাষিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। শুরুতে আমরা এমনটিই ভেবেছি। কিন্তু কথাটি যদি শতভাগ সত্য হবে, তাহলে গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্রের অবসান ঘটবে কেন, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ) পুনরুত্থান ঘটবে কেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানের মাথায় চেপে বসবে কেন? কেনই বা থেকে থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রকাশ ঘটবে, অকারণে কেন হামলা চলবে হিন্দু বা বৌদ্ধপল্লীতে, ধ্বংস করা হবে উপাসনালয়? কেন থেকে থেকে প্রতিমা ভাঙচুর করা হবে সেক্যুলার বাংলাদেশে? বাংলাদেশ তাহলে কীভাবে সেক্যুলার?

বহু ঘটনা এসবের প্রমাণ। গণতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রায় ৯০ শতাংশ নাগরিক মুসলমান এবং যেখানে অসম প্রতিযোগিতার কোনো অবকাশ নেই সেখানে কেন নানা অজুহাতে আক্রান্ত হবে কথিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ সে আক্রমণ প্রতিহত করবে না কেন? এ ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত স্ববিরোধিতার প্রকাশই লক্ষ করার মতো এবং তা যেমন সমাজে, তেমনি রাজনীতিতে।

আর তাতে এমন সত্যই প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পূর্বকথিত দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুতত্ত্ব বর্জন করতে পারেনি, সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র ধরে রাখতে পারেনি। এ ব্যর্থতার পরিণামে বাংলাদেশকে শুদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা কি যুক্তিসঙ্গত হবে? কারণ বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অমুসলিম অধিবাসীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে তাদের পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটার বাসস্থানে। যেমন সংবিধানের ধারায়, তেমনি সামাজিক বাস্তবতায়।

সে জন্যই বলি, রাষ্ট্রনীতি-রাজনীতির পাশাপাশি সমাজেও একই বাস্তবতার প্রকাশÑঅর্থাৎ সংখ্যালঘুতত্ত্বের উপস্থিতি এক অপ্রিয় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সমাজে সর্বমাত্রিক নাগরিক স্বাধীনতা পরোক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ। বারবার সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ ও শুদ্ধ গণতন্ত্রের রাষ্ট্রিক, সামাজিক অবস্থান কি প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে এভাবে দলিত, নিগৃহীত হবে স্ববিরোধিতার প্রকাশ ঘটিয়ে? এ অসঙ্গতিকে কি আমরা ইতিহাসের অসমগতি হিসেবে চিহ্নিত করব, নাকি সামাজিক-সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করবÑরক্তাক্ত দেশ বিভাগও যে সমস্যার সমাধান ঘটাতে পারেনি। অথচ রাজনৈতিক নেতাদের মুখে বিভাগকালে তেমন কথাই শুনেছি আমরা। কিন্তু সেসব ছিল নেতাদের স্বভাবসুলভ কথাবার্তা, মানুষের মাথায় হাত বোলানো।

এ তো গেল সম্প্রদায়গত নাগরিক অধিকারবিষয়ক কথাবার্তা। প্রায় একই ধরনের বিচ্যুতির প্রকাশ দেখতে পাই ভাষা আন্দোলনের মর্মবস্তু একুশে চেতনার অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান, ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই’-এর গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো জাতিরাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তথা মাতৃভাষা জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জীবন-জীবিকার সঙ্গে এর নিগূঢ় সম্পর্ক।

একই কথা সত্য ভাষিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। সংবিধানে এর যথাযথ স্বীকৃতি সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা বাংলা জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে নাÑবিশেষত উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে এবং উচ্চ আদালতে। প্রথমত, আমাদের প্রশ্নÑ বিষয়টি কি সংবিধানের লঙ্ঘন নয়? সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সংসদ সদস্য-বিধায়করা কীভাবে এমন একটি গুরুতর ঘটনার প্রতি চোখ বন্ধ করে আছেন?

এমনকি উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিরা যখন জাতীয় স্বার্থের কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নির্দেশনামা জারি করেন, এ ক্ষেত্রে তারাইবা চুপ করে আছেন কেন? বিষয়টি দুর্বোধ্য, সন্দেহ নেই। কারণ কিছুদিন আগে শুদ্ধ বাংলা লেখা, বানান বিকৃতি রোধে তাদের কেউ রুল জারি করেছিলেন ভাষার প্রতি অবিচার রোধের জন্য। রাজধানীর বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তর্জনী নির্দেশ করেই তাদের ওই রুল জারি। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। অবস্থা ‘যথা পূর্বং তথা পরং’।

বাংলা ভাষা তথা রাষ্ট্রভাষার বিকৃতি ও স্বেচ্ছাচারী ব্যবহার নিয়ে বিচার বিভাগের কারো চৈতন্য বিচলিত হলেও প্রশাসন যে এ বিষয়ে নির্বিকার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ভাষার বিকৃতি নিয়ে নানা মাত্রিক অনাচার চলছে। বেসরকারি বেতারে চলছে উৎকট মিশ্র ভাষার প্রচার, অথচ প্রশাসন নীরব। রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য তাদের কোনো দায়দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। নির্বিচারে চলছে ভাষার চরিত্র হনন। এ বিষয়ে কথিত নাগরিক সুশীল সমাজও নীরব।

এরপর কি ভাষা আন্দোলন নিয়ে, একুশে নিয়ে আমাদের প্রচলিত গর্ব ও অহংকারের কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে? কিংবা মাসব্যাপী ‘অমর একুশে’ পালনের কোনো যৌক্তিকতা মেলে? অবাক হই যে বাংলা একাডেমির মতো ভাষিক প্রতিষ্ঠানকেও ভাষার প্রতি অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায় না; যদিও বলা হয়ে থাকে, বাংলা একাডেমি ভাষা আন্দোলনের ফসল। ভাষা নিয়ে বাঙালির এ-জাতীয় অনীহাও বাঙালির আরেক স্ববিরোধিতা। এ অবস্থার আশু পরিবর্তন চাই।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসৈনিক

"