বিএনপির চোখ এখন নারায়ণগঞ্জে

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ০৮:৪১

বদরুল আলম মজুমদার
ADVERTISEMENT

বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে জয় পায় বিএনপি। দলটির দাবি—যে কয়টি নির্বাচনে জনগণ অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে, ততবারই জয় পেয়েছে দলটি। গেল কয়েক বছর থেকে সব পর্যায়ের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিএনপি আশা করছে, ‘সরকারের আজ্ঞাবহ ইসি’ শেষ সময়ে ভালো একটি নির্বাচন হয়তোবা উপহার দিতে পারে। এমন ভাবনা থেকে বিএনপি নেতারা আশার আলো দেখছেন। দলের নেতারা মনে করেন, জনগণ ভোট দিতে পারলে ধানের শীষের জয় অনিবার্য। তাই সব ধরনের দলীয় ফোকাস এখন নারায়ণগঞ্জমুখী।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনকে দলের পক্ষ থেকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নেতারা মনে করেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন যেভাবে সরকারের হুকুম তামিলে ব্যস্ত থেকেছে, সেই রকম আচরণের হয়তো পুনরাবৃত্তি হবে না এবার। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, শেষ সময়ে এসে কমিশন একটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। এত দিন পর্যন্ত যাই করুক না কেন, শেষ সময়ে এসে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইবে না ইসি। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ইসির কর্মকান্ড নিয়ে তেমন বড় কোনো অভিযোগও তুলতে পারেনি বিএনপি। ইসির ইতিবাচক মনোভাব থেকে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছে বিএনপির।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও এবারের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিএনপি মনে করে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ইসি গঠন নিয়ে সরকার এরই মধ্যে চাপে পড়েছে। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে একাধিক প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এর বাইরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছ থেকে নিরপেক্ষ ইসি গঠনের চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। এমন অবস্থায় সরকার নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে চাইবে না। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকার এবারের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চাইবে না। যদি সরকারি দলের মধ্যে এমন চিন্তা থাকত, তাহলে আইভীর হাতে নৌকা তুলে দিত না দল। সরকার আইভীর জনপ্রিয়তাকে নিজের জন্য কাজে লাগাতে চায়। তারা মনে করেন, একতরফাভাবে নৌকার পক্ষে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে সামনে ইসি গঠনে ঝামেলায় পড়তে পারে সরকার। এমন ভাবনা থেকে ইসি গঠনের অল্প সময় আগে কোনো বিতর্কিত নির্বাচন তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।

সূত্র জানায়, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এমন দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরে বিএনপি দলগতভাবে এখন নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। এমন অবস্থায় একসময়ের গুরুত্বহীন নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে দল। তাই দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নারায়ণগঞ্জে।

দলীয় সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। এই নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চায় দলটি। আপাতত জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে চাইছে না বিএনপি নেতারা। যত ঝড়ই আসুক না কেন, শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার পরিকল্পনা পাকা করেছে দলটির হাইকমান্ড। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এরই মধ্যে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ১৭১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। সার্বিক বিষয় দেখভাল করার জন্য কেন্দ্রভিত্তিক টিম করার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন মনিটরিং করা, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করার জন্য আলাদা টিম করা হবে বলেও জানা গেছে।

এরই মধ্যে বিএনপির আইনজীবী নেতারা পড়ে থাকছেন নারায়নগঞ্জে। তা ছাড়া এবারের সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি অন্য অনেক ইস্যুতে ধীরে চলার নীতি নিয়েছে। সামনের মাসের শুরুতে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালোদ জিয়ার একটি জনসভা করার কথা ছিল। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে সামনে রেখে সে কর্মসূচি থেকে আপাতত পিছু হটেছে দল। আলোচনা আছে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে প্রচারণায় নামতে পারেন খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যে কমিশন থেকেও বলা হয়েছে তার নির্বাচনে নামতে বাধা নেই।

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের অবস্থানের পক্ষে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয় কমিটি করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনকে কমিটির সদস্যে সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, আবদুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল। এ ছাড়া সব অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা এই কমিটিতে থাকবেন।

রিজভী বলেন, আমরা সব সময় বলেছি, নির্বাচনে একটা স্পেস রাখার কথা। আমরা জানি, নির্বাচনের ফল ওরা কেড়ে নিতে চাইবে, নির্বাচনকে নিয়ে যত ধরনের দুর্বৃত্তমূলক আচরণ আছে, তারা করবে। আমরা চেষ্টা করব এর মধ্য দিয়ে জনগণকে জানানো—এরা কত অনাচারকারী, এরা কত ধরনের গণবিরোধী আচরণ করতে পারে। আর যদি সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে তারা ভালো নির্বাচন করবে। বিদায়ী নির্বাচন কমিশন নারায়ণগঞ্জে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকবে এমনটাই আশা করছি আমরা।