বিএনপির কমিটি নিয়ে তুলকালাম, যেভাবে চলে শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ১০:০৮ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ১১:৫৪

বদরুল আলম মজুমদার
ADVERTISEMENT

কমিটি ঘোষণার পর কদিন ধরে বিএনপিতে নানা ঘটনার জন্ম নিচ্ছে। প্রবলভাবে আপত্তি উঠছে এই বলে যে, দলটির ভেতরের প্রভাবশালী অংশের ইচ্ছাখুশিতে সাজানো হয়েছে গোটা কমিটি। কমিটি গঠনে ওই অংশের শতভাগ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটলেও আশাহত হয়েছেন অন্যরা। কাউন্সিলের পাঁচ মাস পর বিশাল বহরের কমিটি ঘোষণা করেও নেতাকর্মীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমিত করা যায়নি। কমিটি নিয়ে বিস্তর অভিযোগের পাশাপাশি ঘটে বেশ কটি পদত্যাগের ঘটনা। কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন না হওয়ায় পদত্যাগ বা নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন আরো প্রায় শতাধিক নেতা। নিষ্ক্রিয় থাকার তালিকায় বেশ কজন কেন্দ্রীয় নেতাও  রয়েছেন। যাদের দেশব্যাপি রয়েছে পরিচিতি। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ক্ষুব্ধ ঘোষিত তালিকা দেখে। তার দেওয়া তালিকায় বাদ গেছেন বেশ কজন নেতা। আবার অনেককে দেওয়া হয়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে। এ নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান চরমভাবে ক্ষুব্দ হয়েছেন কজন নেতার ওপর। যারা চেয়ারপারসনকে বিভিন্ন বিষয়ে ভুল বুঝিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কমিটি নিয়ে দলের ভেতর-বাইরের বেশ কটি সূত্র এমন তথ্য  জানিয়েছে। 

দলের একটি সূত্র জানায়, সদ্য ঘোষিত কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতা ও চেয়ারপারসনের একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশেষ এ বলয়। এই বলয়ের সদস্যদের টার্গেট হলো চেয়ারপারসনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। রাতদিন চেয়ারপারসন যাদের সঙ্গে কথা বলেন তাদের সবাই যাতে এই বলয়ের উদ্দেশ্য সাধন করেন, এ লক্ষ্যে তারা আগ থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে রেখেছে। প্রভাব বিস্তার করতে বিভিন্ন কৌশলেরও আশ্রয় নেন তারা। পরিকল্পনা করে কিভাবে খালেদা জিয়াকে তাদের বলয়ে আনা যায়। এই পরিকল্পনায় যাদের বাধা মনে করা হয়েছে তাদের সরানো হয়েছে গত তিন-চার মাসে। প্রভাবশালী এই বলয়টির প্রথম লক্ষ্য ছিল, যারা সবসময় বেগম জিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন তাদের সরিয়ে দেওয়া। এ কৌশলে তারা সরিয়ে দেন চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত দুই নেত্রী রেহানা আক্তার রানু ও শিরিন সুলতানাকে। তারপর অন্য যিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলতেন তিনি হলেন মেজর (অব) আব্দুল মজিদ। তার বাড়ি নোয়াখালি। প্রভাব বলয়ের এক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারসহ অসংখ্য অভিযোগ কানে তোলেন চেয়ারপারসনের। একপর্যায়ে গত জুন মাসে তাকেও চেয়ারপারসনের অফিস থেকে বিদায় জানানো হয়। 

নিরাপত্তা কর্মকর্তা মজিদের সঙ্গে আরো যে দুজন কর্মকর্তাকে বিদায় করা হয়, তারা হলেন মেজর ওয়াজেদ (অব.) এবং মেজর মোহাম্মদ আনোয়ার (অব.)। তাদের বিরুদ্ধে চেইন অব কমান্ড ভঙ্গের পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছিল। মূলত এগুলো ছিল চেয়ারপারসনের বিশেষ ওই কর্মকর্তার কূটকৌশল। তাদের স্থলে প্রভাবশালী বলয়ের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর আজিজ রানা (অব.)-কে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

দলের প্রভাবশালী দুই মহিলা নেত্রী এবং ফেনী নোয়াখালী অঞ্চলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে সরানোর ফলে বেগম জিয়ার আশে পাশে প্রভাবশালী বলয়ের সদস্যদের বাইরে এখন আর কেউ নেই। বর্তমানে যারা আছেন তারা বিশেষ ওই কর্মকর্তার আশীর্বাদ পুষ্ট। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন চেয়ারপারসনের বাসা ও অফিস। বর্তমানে এদের সম্পর্কে কিছু বলার জন্য খালেদা জিয়ার পাশে আর কেউ রইলো না। 

খালেদা জিয়ার বাসা ও অফিসের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন প্রভাব বলয়ের সদস্যরা। সম্প্রতি পাবনা থেকে শিমুল বিশ্বাসের কাছে আসা এক নেতার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি নামপ্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে চালান এখন শিমুল বিশ্বাস। যা চেয়ারপারসনের অফিসে গিয়ে নিজ চোখে দেখলাম। তার জানার বাইরে কোন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা এখন আর বিএনপিতে নেই। তিনি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন চেয়ারপারসনকে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সকল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চেয়ারপারসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তিনি। আর এভাবে শিমুল বিশ্বাস গড়ে তোলেন একটি নিজস্ব বলয়। তার এই একক বলয়ে গত ক’বছর ধরে শলাপরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন দলের সদ্য নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। 

পাবনার এই নেতা আক্ষেপ করে একটি ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, কমিটি ঘোষণার পরদিন তারেক রহমানের মালিকানাধীন দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক মানিক, তারা, অন্তুসহ চারজন শিমুল বিশ্বাসের কাছে যায়। ঘোষিত কমিটিতে দিনকালে অর্থ পৃষ্ঠপোষকতা দেন এমন ছয়জনের মধ্যে মধ্যে চার জনের নান আসেনি। দুজন যারা এসছেন তারা হলেন পঁচা আলম এবং জনৈক কাকড়া ব্যবসায়ী। এর বাইরে যে চারজনকে কমিটিতে রাখা হয়নি তারা আর অর্থ সহায়তা দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তারেক রহমান বলার পরও কেন তাদের কমিটিতে রাখা হয়নি এমন প্রশ্নের উত্তরে শিমুল বিশ্বাস তাদের বলেন, তারেক তোমাদের বলেছে, তালিকা দিয়েছে, কই আমাকে একটি ফোন করলেই তো পারতো। আমি তাদের নাম বসিয়ে দিতাম। এখন তোমরা এসেছো কেন? আমার কিছু করার নেই। তারেক রহমান বলার পরও কমিটিতে তাদের না রাখার ব্যাপারে ওই নেতা আক্ষেপ করে বলেন, তারেক রহমানের দলে পদ পেতে হলে এখন শিমুল বিশ্বাসকে বলতে হবে। এই হলো বিএনপির আসল চিত্র। 

এ বিষয়ে শিমুল বিশ্বাসের কাছে যাওয়া দিনকালের একজন সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তারা শিমুল বিশ্বাসের কাছে গেছেন, বিষয়টি স্বীকার করেছেন। দিনকালের এ সাংবাদিক চেয়ারপারসনের কর্মকর্তার উপর নিজের ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন এ বিষয়ে  কিছু না লিখতে। তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, চেয়ারপারসনের ওই কর্মকর্তা সরকারের হয়ে কাজ করছেন এবং প্রতিটি কাজ এমনভাবে করছেন যাতে নিজের ঘাড়ে দোষ না চাপে। 

দলের অন্য একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ খ্যাত বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালুকে ফাঁদে ফেলেছেন শিমুল বিশ্বাস। ঘটনাসূত্রে জানা যায়, কাউন্সিলের পর ফালু আটজনের একটি তালিকা দেন বেগম জিয়াকে। যাদের বিভিন্ন পদে আনার সুপারিশ করেন ফালু। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর দেখা যায় তাদের কাউকে রাখা হয়নি। ফালুর দেওয়া তালিকায় উত্তরা ও তেজগাঁওয়ের দুজন নেতা আছেন বলে জানায় সূত্রটি।  ফালুর তালিকাতে যাদের নাম ছিল তারা আট জনই কি কমিটিতে আসার অযোগ্য- এমন প্রশ্ন করলে ফালুর ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন, আসলে ফালুর দেয়া তালিকাটি হয়তো কৌশলে গোপন করা হয়েছে অথবা ভিন্ন কিছু ঘটেছে। চেয়ারপারসনের পক্ষে এত কিছু তো মনে রাখা সম্ভব নয়। এটা করা হয়েছে ফালু যাতে রাগে ক্ষোভে চেয়ারপারসনের কাছে না আসেন। একটা দূরত্ব তৈরি করার জন্যই এমনটা করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বাস্তবেই কমিটি ঘোষণার পর ফালু অভিমান করে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। 

এছাড়া খালেদা জিয়ার আরেক ঘনিষ্ঠ নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটিতে তাকে নেয়ার ব্যাপারে জোর আলোচনা থাকলেও রিজভী-শিমুল বলয় তাতে বাধ সাধেন বলে অভিযোগ ওঠে। তাছাড়া মিন্টুর দেওয়া বেশ কটি নামের তালিকাও আমলে নেওয়া হয়নি। যাতে শিমুল-রিজভীর হাত থাকতে পারে বলে অভিযোগ করছেন মিন্টুর নিকটজনেরা। তারা মিন্টুকে চেয়ারপারসনের কাছে বিব্রতকর অবস্থায় ঠেলে দিয়েছেন। এ অবস্থায় কমিটি ঘোষণার পর এখনো চেয়ারপারসনের অফিসে যাননি বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু।   

চেয়ারপারসনের অফিস ও দিনকালের সূত্রগুলো  জানায়, বিএনপির কমিটি ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত ছিল বুধবার। এ বিষয়ে তারেক জিয়ার পক্ষ থেকে দিনকাল অফিসে দিনের বারোটার দিকে একটি প্রেস রিলিজ আসার কথা বলা হয় মালয়েশিয়া থেকে। সেই ফোনে কমিটি ঘোষণার প্রেস রিলিজের কথা বলা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই কমিটি ঘোষণা দুই দিন পিছিয়ে যায়। তারপর কমিটির কপি শনিবার সকাল ১০ টায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের হাতে পৌঁছানো হয়। মহাসচিব সেটি ঘোষণা করেন গত শনিবার দুপুর বারটায়। পুরো কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় একেবারেই অন্ধকারে ছিলেন মহাসচিব। তাছাড়া মহাসচিবের বলয়ে থাকা সাদেক হোসেন খোকাসহ তার গ্রুপের নেতাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে দলের দাদা খ্যাত গয়েশ্বর রায় নিজের মেয়ে ও ছেলের বউয়ের নাম লিখিয়ে নিয়েছেন কমিটিতে।

সূত্র জানায়, কমিটি ঘোষণার আগে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চেয়ারপারসনের অফিসে আটকা পড়েছেন বলে খবর দেয় বিভিন্ন মিডিয়ায়। এ খবর চেয়ারপারসনের অফিসের কারো পক্ষ হতে দেওয়া হয়নি। রিজভী নিজেই আটকা পড়ার কথা জানান মিডিয়াকে। জানা যায়, গ্রেফতারি ফরোয়ানার অজুহাতে গুলশান অফিসে রিজভী আসেন বুধবার। সেই দিনই কমিটি ঘোষণার কথা ছিল। যা তারেক জিয়ার জানায় ছিল। এর আগে মঙ্গলবার সারাদিন চেয়ারপারসন অফিসের ছাদের উপর একটি রুম শিমুল বিশ্বাসের হুকুমে পরিস্কার করা হয়। সেখানেই তিন দিন অবস্থান করেন রিজভী। তারপর শুক্রবার রাতে তিনি সেখান থেকে আত্বগোপণে চলে যান। সেখানেই দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন রিজভী ও শিমুল বিশ্বাস। তারা পুরো কমিটিতে বেশ কিছু জায়গায় কাটাছেঁড়া করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সূত্র মতে, দলের দফতর সম্পাদক পদে তারেক জিয়ার পছন্দ করা একটি নাম ছিল।  সেখানে থেকে নামটি বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তারেক জানতে পারে কমিটি ঘোষণার পর। সেখানে দলের সহ দফতর সম্পাদক পদে অন্য কয়েক জনের নাম ছিল।  যা শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করা হয় বলে জানতে পারেন তারেক রহমান। ফলে ঘোষিত কমিটিতে নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করেন রিজভী আহমেদ। এছাড়া দলের কমিটিতে সিনিয়রিটি নিয়ে যে ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে এমনটা বেগম জিয়া চাননি। অনেকে বলছেন, ইতিপূর্বে রাজনৈতিক দলের ঘোষিত কমিটিতে তা খুব বেশি দেখা যায় না। যারা একই পদে থাকবেন সেখানে সিনিয়রিটি অবশ্যই মানতে দেখা যায়। তারেক রহমানও বিষয়টি নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ আছেন। এ নিয়ে কিছু সংশোধণী আনতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বেগম জিয়াকে। আসছে হজের সময় তারেক জিয়ার সঙ্গে দেখা হলেই সব কিছু ঠিক করা হবে বলে জানা যায়। এসব বিষয়ে কিছু অনিয়মের কথা জানতে পারেন খালেদা জিয়াও। কমিটিতে নাম নেই এমন কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গুলশান অফিসে যান। এতে তারা কমিটিতে নিজের নাম না থাকায়, হতাশার কথা জানান বেগম জিয়াকে। এসময় খালেদা জিয়া বলেন, তোমাদের তো কমিটিতে রাখা হয়েছে। নাম নেই শুনে তিনি বিষয়টি আর বাড়তে না দিয়ে ঠিক করার কথা বলে নেতাদের শান্ত করেন। 

রিজভীকে চেয়ারপারসনের অফিসে রাত কাটাতে দেয়া এবং কমিটির বিষয়ে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস বলেন, আমি এখন কথা বলতে পারবো না। আমার সামনে অনেক লোকজন আছেন। এ বলে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার তার ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে রিজভী আহমেদ আত্মগোপনে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।