যুদ্ধাপরাধ

সাখাওয়াতের মৃত্যুদণ্ড, আমৃত্যু সাজা ৭ জনের

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৬, ১২:১৯ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৬, ১৯:৫৭

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

একাত্তরে যশোরের কেশবপুরে বিভিন্ন গ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে সাবেক সংসদ সদস্য সাখাওয়াত হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুধবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে এই রায় ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা পাঁচ অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। 

এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে আসামিদের চারজন, দ্বিতীয় অভিযোগে আটজন, তৃতীয় অভিযোগে চারজন, চতুর্থ অভিযোগে পাঁচজন এবং পঞ্চম অভিযোগে ছয়জন আসামি ছিলেন। রায়ে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে আদালত বলেছে, সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে তাদের দণ্ড কার্যকর করতে পারবে। আর মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, এম এ আজিজ সরদার, আব্দুল আজিজ সরদার, কাজী ওহিদুল ইসলাম ও মো. আব্দুল খালেককে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড  

 

আসামিদের মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাখাওয়াত ও বিল্লাল হোসেন রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি ছয়জনকে পলাতক দেখিয়েই এ মামলার বিচার চলে।

তাদের সঙ্গে মো. লুৎফর মোড়ল নামের আরেকজন এ মামলার আসামি ছিলেন। কারাবন্দি থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায় তার নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়। 

মামলার অভিযোগপত্র্রে বলা হয়, এরা সবাই একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সাখাওয়াত সে সময় ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য। ওই সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে আল বদর বাহিনী গঠিত হয়েছিল। আর বাকিরা ছিলেন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত রাজাকার বাহিনীর সদস্য। সে সময় যশোরের কেশবপুরে তারা যেসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটান, তা এ মামলার বিচারে উঠে এসেছে। 

বর্তমানে জাতীয় পার্টিতে থাকা সাখাওয়াত এক সময় ছিলেন জামায়াত নেতা। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। মাওলানা সাখাওয়াত নামে বেশি পরিচিত এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে এলডিপি ও পিডিপিতেও ঘুরে এসেছেন।

 

নিয়ম অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পাবেন ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত আসামিরা। তবে পলাতকদের এ সুযোগ নিতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হবে। 

ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত রায় আসা ২৫টি মামলার ৪৪ আসামির মধ্যে মোট ২৭ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হল।

আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার দুজনকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। পৌনে ১১টার দিকে তাদের তোলা হয় কাঠগড়ায়। এর পরপরই তিন বিচারক আসন গ্রহণ করেন।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ৭৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সার সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন। অপর বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীও এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাজা ঘোষণা করেন।

মো. সাখাওয়াত হোসেন

 

১৯৫৪ সালে যশোরের হিজলডাঙ্গা গ্রামে জন্ম নেওয়া সাখাওয়াত ১২ বছর বয়সেই যোগ দেন জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘে।

পরের বছর আলিম এবং ১৯৬৯ সালে ফাজিল পাস করেন; খুলনার আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৭১ সালে কামিল পরীক্ষা দিলেও সে বছরের পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ায় পরের বছর আবারও পরীক্ষায় বসতে হয় সাখাওয়াতকে।

বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ থেকে এম এ পাস করেন সাখাওয়াত। স্বাধীনতার পরপরই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে।

শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে ১৯৮১ সালে অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল (এজি) অফিসে চাকরি নেন সাখাওয়াত। পাঁচ বছর পর হন জামায়াতে ইসলামীর ‘রুকন’।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে যশোর-৬ আসন থেকে এমপি হয়ে যান এই যুদ্ধাপরাধী। এরপর জামায়াত ছেড়ে যোগ দেন বিএনপিতে; ১৯৯৬ সালে আবারও সাংসদ নির্বাচিত হন। 

মাওলানা সাখাওয়াত নামে বেশি পরিচিত এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে এলডিপি ও পিডিপিতেও ঘুরে এসেছেন। ২০০৮ সালে সাখাওয়াত যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও যশোর-৬ আসন থেকে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস

১৯৪০ সালে যশোরের কেশবপুরের নেহালপাড়া গ্রামে জন্ম নেন বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন বলে প্রসিকিউশনের তথ্য।

মো. ইব্রাহিম হোসাইন ওরফে ঘুঙ্গুর ইব্রাহিম

ইব্রাহিম হোসেনের জন্ম যশোরের কেশবপুরের নেহালপুর (বর্তমান নাম বগা) গ্রামে। ৬০ বছর বয়সী ইব্রাহিম ‘ঘুঙ্গুর ইব্রাহিম’ নামেও পরিচিত ছিলেন বলে প্রসিকিউশনের ভাষ্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং সাখাওয়াতের সহযোগী হিসেবে যুদ্ধাপরাধে অংশ নেন বলে এ মামলায় অভিযোগ আনা হয়।

শেখ মো. মুজিবুর রহমান ওরফে মুজিবুর রহমান

যশোরের কেশবপুর থানার শেখপাড়া গ্রামের মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ৬১ বছর বয়সী এ ব্যক্তিও সে সময় সাখাওয়াতের সহযোগী ছিলেন।

এম এ আজিজ সরদার

যশোরের কেশবপুরের মোমিনপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এম এ আজিজ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাখাওয়াতের সহযোগী হয়ে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়েছেন বলে এ মামলায় অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। ৬৫ বছর বয়সী এ ব্যক্তি সে সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

আব্দুল আজিজ সরদার

আব্দুল আজিজ সরদারের বাড়ি যশোরের কেশবপুর থানার বগা গ্রামে। ৬৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং সাখাওয়াতের সহযোগী হিসেবে যুদ্ধাপরাধে অংশ নেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। 

কাজী ওহিদুল ইসলাম ওরফে কাজী ওহিদুস সালাম

কেশবপুর শেখপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া কাজী ওহিদুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং সাখাওয়াতের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলে এ মামলার অভিযোগ। ওহিদুলের বর্তমান বয়স ৬১ বছর।  

মো. আব্দুল খালেক মোড়ল

যশোরের কেশবপুর থানার আলতাপুল গ্রামের খালেকের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য এবং সাখাওয়াতের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় এ মামলায়।

মো. লুৎফর মোড়ল

যশোরের কেশবপুরের পরচকরা গ্রামে জন্ম নেন লুৎফর মোড়ল। ৬৯ বছর বয়সী এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীতে মো. সাখাওয়াত হোসেনের সহযোগী হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানোর অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন।

মামলা বৃত্তান্ত

# একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যশোরে একাধিক মামলা হলে সেগুলো ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাখাওয়াতসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত দল।

# প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর সাবেক সংসদ সদস্য সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

# ২০১৫ সালের ১৮ জুন প্রসিকিউশন এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে। গতবছর ২৬ জুন অভিযোগ আমলে নেওয়ার বিষয়ে শুনানি হয়।

# ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আদালত নয়জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়। ‘অভিযোগের উপাদান’ না পাওয়ায় তিনজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় ট্রাইব্যুনাল।

# নিয়ম অনুযায়ী পলাতক ছয়জনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তারা তা না করায় এবং পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় তাদের পলাতক দেখিয়েই মামলার বিচার শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। 

# যুদ্ধাপরাধের পাঁচ অভিযোগে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে নয় জনের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।

# চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ‌্যে দিয়ে শুরু হয় এ মামলার সাক্ষ্য ও জেরার কার্যক্রম।

# প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিলেন না।

# দুই পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে গত ১৪ জুলাই আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে।

# প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় শুনানি করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সঙ্গে ছিলেন রেজিয়া সুলতানা চমন।

# গ্রেপ্তার সাখাওয়াত ও বিল্লাল হোসেন বিশ্বাসের পক্ষে আব্দুস সাত্তার পালোয়ান এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান ও কুতুব উদ্দিন আহমেদ এ মামলা লড়েন।