স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি পাননি হালুয়াঘাটের হাজেরা ও রহিমা

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৬, ১৪:২৭

মাজহারুল ইসলাম মিশু
ADVERTISEMENT

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও এখনো ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উত্তর বাজারের হাজেরা খাতুন (৬৫) ও ধারা ইউনিয়নের মকিমপুর নগুয়া গ্রামের রহিমা খাতুন (৫৮) এখনো ‘বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি পাননি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কাছ থেকে আশ্বস্ত হলেও প্রতিক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না হাজেরা ও রহিমার। এর আগে এ বছরের ২১ জুলাই উপজেলার ছয়জন নারী বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পেলেও বঞ্চিত থাকেন হাজেরা ও রহিমা। বীরাঙ্গনা হাজেরা খাতুন বর্তমানে করুণ অবস্থায় বসবাস করছেন। থাকার জন্য রয়েছে তার একটি কুঁড়ে ঘর। তার উপর পলিথিনের ছাউনি। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। ঘরের চারপাশে বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি ছিন্ন-ভিন্ন বেড়া। এমন ঘরে মানুষ যে বসবাস করতে পারে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বর্তমানে সংসার চালানোর মত তার কোন অবলম্বন নেই। ফলে বেশিরভাগ দিনই কাটে অর্ধাহারে-অনাহারে। দরিদ্রের কষাঘাতে জর্জড়িত নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দিন পার করছেন হাজেরা। তিনি এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে বেড়াচ্ছেন। অথচ আজও ভাগ্য খোলেনি হাজেরা খাতুনের।

অতীতের বর্নণা দিতে গিয়ে হাজেরা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, স্বাধীনতা দিবসের ১৪ দিন আগে পাক-হানাদার বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। হালুয়াঘাট থেকে আনুমানিক ৪ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী এলাকায় গোবড়াকুড়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত গারো বাড়িতে তাকে তুলে নিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয় হানাদার বাহিনী। একপর্যায়ে হাজেরা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর তার শরীরের পাশবিক নির্যাতনের ক্ষতচিহ্নগুলোই শুধু দেখতে পান তিনি। কিন্তু সেই রাতের পাকহানাদার বাহিনীর নির্যাতনের ক্ষতচিহ্নগুলো তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি কঠিন বাস্তবতাকে।

তিনি আরও জানান, একদিকে তার উপর চলছে অমানুষিক নির্যাতন, অন্যদিকে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়ে হানাদার বাহিনী করেছিল হত্যা। তার এই করুন পরিণতির পর যে রিক্সা চালক তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ ভর্তি করেছিলো পরবর্তিতে সেই রিক্সা চালক নূর মিয়া তাকে বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়, হাজেরাকে বিয়ে করার অপরাধে তার স্বামী রিক্সা চালক নূর মিয়ার উপর হামলা চালায় স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার বাহিনী, ভেঙ্গে দেয় তার স্বামীর বুকের হাড়। ফলে অভাবের সংসারে উপার্জন করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে অসুস্থ স্বামী নিয়ে কোন রকমভাবে বেঁচে আছেন তিনি। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসার খরচ চালাতে হিমশিত খাচ্ছেন স্বাধীনতার সময় নির্যাতিত এই নারী। অথচ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মুখ খোলেননি হাজেরা। বর্তমান সরকার বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে চলেছেন হাজেরা। আবেদন করেন বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতির আবেদনের জন্য।

অপরদিকে উপজেলার ধারা ইউনিয়নের মকিমপুর নগুয়া গ্রামের রহিমা খাতুন (৫৮) এখনো ‘বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি পাননি। ১৩ বছর বয়সে বাবা মৃত আব্দুর রেজ্জাক তার কন্যা রহিমা খাতুনের বিয়ে দিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী নড়াইল ইউনিয়নের মতিন মিয়ার সাথে। সংসার জীবনের মাস দু’একের মধ্যেই নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। সেদিনের কথা বর্নণা করতে গিয়ে রহিমা খাতুন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, স্বাধীনতার সময় তখন যুদ্ধ চলছে চারদিকে শুধু গুলির আওয়াজ, হঠাৎ ৫ থেকে ৬ জন পাকবাহিনীর সদস্য মুরগী নেওয়ার কথা বলে আমার ঘরে প্রবেশ করে, এসময় আমার স্বামী দৌড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। বাড়ি ফাঁকা পেয়ে পালাক্রমে পাকবাহিনীর সদস্যরা আমাকে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। পরে আমার স্বামী বাড়ি ফিরে ঘটনা শুনে আমাকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।  আমার বাবা স্বাধীনতার কিছুদিন পর আমাকে সীমান্তের কাছে বিয়ে দিলেও ঐ পরিবার আমার নির্যাতনের কথা শুনে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তার পর থেকে আমি আমার বাবার বাড়িতেই থাকি।

কিভাবে সংসার চালান জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন , আমার বাবা-মা, সন্তান কিছুই নেই, ভাই আছে কিন্তু তাদেরই চলে না আমাকে কি দেখবে। এই বয়সে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে আমার সংসার চালাই, শরীর আর আগের মতো ভালো নেই, সরকার যদি আমাকে একটা ব্যবস্থা করে দেই তাহলে এই বয়সে একটু শান্তিতে বাঁচতে পারবো।

এ ব্যাপারে হালুয়াঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কবিরুল ইসলাম বেগ বলেন, প্রয়াত মাননীয় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আ্যডভোকেট প্রমোদ মানকিন স্যারের মাধ্যমে আমরা হাজেরা ও রহিমার আবেদনপত্র সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। ওই আবেদনপত্রে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী স্বাক্ষর করেছেন। দেরিতে হলেও হাজেরা ও রহিমা ‘বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি পাবেন এ আশাই করি। ইতোমধ্যে যাদের আবেদন আগে জমা হয়েছিল তারা ‘বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যে হাজেরা ও রহিমাও ‘বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি পাবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।