সু চির শান্তি পুরস্কার কার জন্য?

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০৯:১৯ | আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৬, ০৯:৩০

আলমগীর খান
ADVERTISEMENT

গত ৯ অক্টোবর এক হামলায় বার্মার ৯ জন সীমান্ত পুলিশ মারা যাওয়ার পর থেকে দেশটির সামরিক বাহিনী আরাকানবাসী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাচ্ছে। হত্যা করা হয়েছে শত শত মানুষ, সেনারা হাজারের ওপর বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, নারী ধর্ষণ ও বাড়িঘর লুণ্ঠন করছে বর্বরতম উপায়ে। এসবই হচ্ছে বার্মার গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে যে সরকারের নেতৃত্বে আছেন আবার একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বখ্যাত সু চি। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্ণবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বহু বছর ধরে চলছে। জাতিসংঘের মতে, রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীসমূহের একটি। অথচ তারা একটি স্বাধীন দেশ বার্মার নাগরিক আর যে দেশ কোনো যুদ্ধের শিকার নয় ও যার অধিকাংশ মানুষ অহিংস বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। সিরিয়ার মানুষের জন্য আলেপ্পো যা, রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য বার্মার রাখাইন রাজ্য খানিকটা তাই। কিন্তু পূর্ব আলেপ্পোর মানুষের দুর্ভোগের জন্য যেখানে পরাশক্তিসমূহের স্বার্থচিন্তা ও অহমবোধ দায়ী, রোহিঙ্গাদের জন্য দায়ী তাদের নিজ দেশেরই সরকার। যে সরকার জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক।

অথচ এই সরকারের নেতৃত্বে আছেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি দেশটির স্বৈরাচারী সরকারকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসেছেন। গণতন্ত্রের জন্য সু চির দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন ও তার অহিংস জীবনাদর্শ মানুষকে তার ওপর ভরসা রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার মহান পিতা বার্মার স্বাধীনতার স্থপতি জেনারেল অং সান ১৯৪৭ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে দেশটির স্বাধীনতা লাভের ছয় মাস আগে আততায়ীর হাতে নিহত হন। দেশকে তিনি সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতপাতের ঊর্ধ্বে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক শাসনের কবলে পড়ে বার্মা তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই সামরিক শাসকগোষ্ঠী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে থাকে।

বার্মা বহু ধর্ম ও বহু জাতির দেশ। আসলে আজকের পৃথিবীর সব দেশই কমবেশি তাই। যদিও কোনো বিশেষ ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকাই স্বাভাবিক। মিয়ানমারে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বামার জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। অবৈধ সামরিক সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে মুসলিম বিদ্বষকে উসকে দেয়। উগ্র বৌদ্ধ মৌলবাদীরা সব সমস্যার গোড়ায় সেখানকার মুসলমান—এমন একটি প্রচারণা ছড়ায়। ফলে আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। ৩০ বছর আগে এমনকি তাদের নাগরিকত্বও বাতিল করা হয় ও নির্যাতন বাড়ানো হয়। শুরু হয় তাদের স্বদেশ থেকে উচ্ছেদ করা ও পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া।

উগ্রপন্থী মাবাথা ও ৯৬৯ সংগঠন দুটো সে দেশের সামরিক শাসকের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর কাজ করতে থাকে। সরকারকে দিয়ে তারা মুসলিমবিরোধী চারটি আইন পাস করায় যাতে একাধিক বিয়ে, ধর্মান্তরকরণ, ভিন্নধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে ও পরিবারে অধিক সন্তান নেওয়া ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। যাতে রোহিঙ্গাদের সর্বতোভাবে কোণঠাসা করাই উদ্দেশ্য। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ে এই উগ্রপন্থীদের আনন্দের শেষ ছিল না। উগ্রবাদী নেতা বীরাথু তো ট্রাম্পকে তারই ফটোকপি মনে করেন। কিন্তু বার্মার শান্তিবাদী জনগণ ভোটের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী সরকারকে পরজিত করে সু চি’র নেতৃত্বাধীন এনএলডি দলকে ক্ষমতায় আনে। মানুষের ধারণা হয়েছিলো সু চি তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষা করবেন।

নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপারে সু চি আগেও প্রশ্নসাপেক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের ওপর বর্বর নির্যাতনের কোনো ঘটনাকে তিনি কখনো নিন্দা করেননি, প্রতিবাদ দূরের কথা। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও তিনি সবসময় এড়িয়ে গেছেন, ‘তারা’ সর্বনাম দিয়ে কাজ চালান। যেহেতু সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদীরা তাদের ‘বাঙালি অভিবাসী’ বলে থাকে, তিনি তাদের সমর্থন ও ভোট হারাতে চানাননি। সু চি’র সমর্থকরা তখন যুক্তি দিয়েছেন যে, তিনি তো আসলে একজন ‘রাজনীতিক’, সুতরাং ভোটের হিসাব তাকে প্রথমেই করতে হবে। তারা আশা করতেন, একবার ক্ষমতায় গেলে সু চি বদলে যাবেন এবং দেশকে আধুনিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রাদর্শে গড়ে তুলবেন। কিন্তু সু চি’র সরকারের ছত্রছায়ায় রাখাইনে যে গণহত্যা চলমান, তাতে সে বিশ্বাস আর কারো নেই।

বরাবরের মতো এখনো সু চি রোহিঙ্গা মুসলমান নিধনের ব্যাপারে তার বিশ্ববিখ্যাত নীরবতা বজায় রেখে চলেছেন। তার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর সামরিক হামলাকে অস্বীকার করছে। ভাব করছে, কিছুই হচ্ছে না। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা যখন এ নির্যাতনকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলছেন, সেখানে সু চি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। কোনো উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করছেন না। কোনো সাহায্য সংস্থা ও গণমাধ্যমকে নির্যাতন এলাকায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ প্রায় দেড় লাখ মানুষ খাদ্য ও পথ্যের অভাবে এখন মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ সু চি’র এই নীরবতাকে গণহত্যায় পৃষ্ঠপোষকতা বলে মনে করছেন।

সু চির হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আবারো। যে নোবেল পুরস্কার এখন রোহিঙ্গা রক্তে রঞ্জিত। সু চি যে নিজেও একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি তা আগেও ধরা পড়েছিল। ২০১৩ সালে বিবিসির মিশাল হুসেন তার একটি সাক্ষাৎকার নেন যাতে তিনি তাকে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে এমনসব প্রশ্ন করতে থাকেন যাতে সু চি অস্বস্তিতে পড়ে যান। শোনা যায়, এ সাক্ষাৎকারের পর সু চি মন্তব্য করেন, ‘আমাকে তো কেউ বলেনি যে একজন মুসলিম নারী আমার সাক্ষাৎকার নেবে।’ এই ছোট্ট মন্তব্যের মধ্যে একটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ স্পষ্ট। এরপর ইন্দোনেশিয়ান করাপশন ওয়াচের ইমারসন ইয়ুনথোর উদ্যোগে সু চি’র নোবেল শান্তি পুরস্কার বাতিলের জন্য আবেদন করে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছে। আর স্বাক্ষর না করলেও এই দাবিকে এখন সমর্থন করছেন পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ।

স্পষ্টতই, বার্মায় ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে মাত্র। গণতন্ত্রের বিশ্বপ্রতিমা বলে পরিচিত সু চি গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন কেবল। পূর্বের সামরিক ও বর্তমানের এই গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে কোনো চরিত্রগত পার্থক্য নেই। সু চির সরকারের কাছে কেউ আমূল পরিবর্তন আশা করেনি। তাদের কাছে অন্তত জনগণের প্রতি একটা ন্যূনতম গণতান্ত্রিক আচরণ সকলে আশা করেছিল। রোহিঙ্গা মুসলমানদের অবস্থা আগের সামরিক সরকারের আমলের চেয়েও খারাপ হবে, এতটা কেউ ভাবেনি। আর রোহিঙ্গাদের ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে একটা দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করা হচ্ছে, তাও কোনো দূরদৃষ্টির পরিচয় দেয় না, দুরভিসন্ধির পরিচয় দেয় মাত্র।

আর কদিন পরই বারাক ওবামা হচ্ছেন বেকার, জেমস বেকার নয়, খাঁটি কর্মহীন। গত মাসে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তাই চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দেন তিনি। কৌতুকপ্রিয় ওবামা যিনি তার গত ৮ বছরের চাকরিতে কোনো পদোন্নতি দেখেননি তার বায়োডাটা নিয়োগকর্তাকে দেন। নিয়োগকর্তা প্রশ্ন করেন, তার কী যোগ্যতা আছে। ওবামা উত্তর দেন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। নিয়োগকর্তা চশমার ওপর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী কারণে?’ হতবুদ্ধি ওবামা বলেন, কী কারণে তিনি নিজেও জানেন না। ওবামা কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নোবেল কমিটির কাছেও আছে কি না সন্দেহ। ওবামার মহত্ত্ব এখানে যে, কৌতুকের শর তিনি নিজের দিকেও ছুড়ে মারেন।

সু চির কাছে কেউ এতখানি আশা করে না। আর নোবেল কমিটিও তার শান্তি পুরস্কার কেড়ে নেবে না, সবাই জানে। সু চি যদি শুধু এটুকু স্বীকার করতেন যে, তিনি তাকে দেওয়া শান্তি পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাহলেও তার সততার একটা পরিচয় পাওয়া যেত।

লেখক: গবেষণা ও প্রকাশনা কর্মকর্তা, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস (সিদীপ)