আসছে রোহিঙ্গা, ভরছে কক্সবাজার

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৬, ২১:১৪

রিহাব মাহমুদ
ADVERTISEMENT

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার এই খবর নতুন নয়। মুসলিম বিশ্ব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ক্ষণ গুনছে এইসব অসহায় মানুষের কথা ভেবে। এইসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে সহজ পথ বাংলাদেশের সীমান্ত। বিজিবি সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকালেও বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শতশত রোহিঙ্গা ঢুকে পড়ছে দেশে। 

তাদের চেহারা ও গঠনপ্রকৃতি বাঙালিদের মতো হওয়ায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাঙালি আখ্যায়িত করে মিয়ানমারের আরাকান থেকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে মিয়ানমার। নির্যাতন, অত্যাচার সহ বিশ্বাসগত কারণে একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ রোহিঙ্গা মুসলমানরা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছেন।

ফলে নতুন করে কক্সবাজারে সীমান্ত অঞ্চলসহ পুরো জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল রোহিঙ্গাদের ভারে নুয়ে পড়ছে।

১২ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। এরমধ্যে টেকনাফ নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পেই আশ্রয় নিয়েছে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা। এসব ক্যাম্পের প্রতিটি ঘরে ঘরে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী।

কক্সবাজার প্রতিনিধির সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমানর সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে নাফনদী পাড়ি দিয়ে প্রতিদিনই শত শত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে দিনের আলোতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কড়া টহল দিলেও রাতের অন্ধকারে দালালদের মাধ্যমে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

রোববার ভোরে উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় রোহিঙ্গা বোঝাই আরো ৬টি নৌকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রতি নৌকায় অন্তত ১০ জন রোহিঙ্গা ছিল। বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও উখিয়ায় ৫ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক (ফেরত) করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সদস্যরা।

যদিও প্রশাসন বলছে, অনুপ্রবেশ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু শনিবার রাতেও অন্তত ২৫জন অনুপ্রবেশকারী কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছেন।
অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগই কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত জনপদে, বান্দরবান পাবর্ত্য জেলার লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ির গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার ঘুমধুম, বালুখালীসহ বিভিন্ন এলাকার বসতবাড়িগুলো অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন প্রতিনিধি। 

জানা গেছে, ১২ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এরমধ্যে টেকনাফ নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি জানান, টেকনাফের হোয়াক্ষ্যং, কাটাখালী, উলুবুনিয়া, উনচিপ্রাং, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকা ঘুমধুম, তমব্রু, বাইশফাঁড়ি দিয়ে রাতের আধাঁরে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে।

উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবির ইনচার্জ আরমান শাকিব আমাদের প্রতিনিধিকে জানান, অনিবন্ধিত শিবিরে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর কথা তিনি শুনেছেন। তবে নিবন্ধিতদের এলাকাতে একজনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নেই। এখানে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে।

তিনি আরো জানান, কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ১৩ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন। আর এই শিবিরের তিনদিক ঘিরে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু সেখানে তার যাওয়ার বা এ নিয়ে কোনো কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন বলেন, শরনার্থী শিবিরগুলোতে যাওয়ার এখতিয়ার তাদেরও নেই। প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিজিবির কাছে তুলে দিচ্ছে।

সহকারী পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) আব্দুল মালেক বলেন, এ পর্যন্ত কতজন অনুপ্রবেশ করেছে এই ডাটা স্ব স্ব থানাগুলো দিতে পারবে। তবে তারা অনুপ্রবেশ রোধ করতে ব্যবস্থা নিয়েছে।

অনুসন্ধনে জানা যায়, সর্বপ্রথম বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসে ১৯৭৮ সালে। এরপর দ্বিতীয় দফা রোহিঙ্গা আসে ১৯৯১-৯২ সালে।

উদ্বেগের সাথে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রত্যাবাসন শুরু হয়। ২০০৫ সালের পর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে যায়। এর পর প্রতি বছর বছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। ফলে সরকারের ঘাড়ে চেপে রয়েছে রোহিঙ্গা নামক সমস্যার বিশাল বোঝা।

সরকারি হিসাব মতে, টেকনাফের নয়া পাড়া ও উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বৈধ রোহিঙ্গা আছেন ২৩ হাজার ৯৫৭ জন। লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে আন রেজিস্টার্ড প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গার বসতি রয়েছে। উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে প্রায় ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা জড়ো হয়েছেন। সব মিলে বৈধ-অবৈধ ভাসমান রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ বলে জানা গেছে।