ফিলিস্তিন: সংকুচিত স্বপ্নের নাম স্বাধীনতা

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ১২:০৭

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাত দশকের ধারাবাহিক সামরিক-বেসামরিক আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত ফিলিস্তিনের জাতীয় স্বপ্ন স্বাধীনতা। সাত দশকের ধারাবাহিক পরিকল্পিত আক্রমণে ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনি জাতির অধিকার ভূলুণ্ঠিত। ফিলিস্তিনি জাতির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষপাতমূলক ভূমিকায় ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ক্রমেই সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের ইন্ধনে বেপরোয়া ইসরায়েলের নিপীড়ন-নির্যাতনে নিজ ভূমি থেকেই উৎখাতের পথে ফিলিস্তিনি জনগণ। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ বরাবরই বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ থেকেছে এবং থাকছে। গত দুই দশকের আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সূত্রধরে ইতোমধ্যে ধামাচাপা পড়েছে ফিলিস্তিন ইস্যু। এই প্রেক্ষিতে ইসরায়েল কর্তৃক সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কাঠামো প্রায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সংগত কারণেই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—’৪৮ সালের বিভক্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি জাতির জাতীয় স্বাধীনতার স্বপ্ন কি পূরণ হবে? অন্যদিকে পশ্চিমতীরকেন্দ্রিক চলমান ফিলস্তিন রাষ্ট্রের যে কাঠামো এরই ভবিষ্যৎ কি?

ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূমির দখলকেন্দ্রিক আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে জটিল ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক অসন্তোষ, বিভক্তি সর্বশেষ আরব বসন্তের প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক যুদ্ধের যে প্রবল সম্ভাবনা—এর সবই ফিলিস্তিনি সম্পৃক্ততার সম্প্রসারিত অবয়ব। যার মূল কারণ ইসরায়েল কর্তৃক আরো ভূমি দখলের মাধ্যমে ফিলস্তিনি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়া। মূলত এই কাজ তারা সম্পন্ন করছে ধীরে ধীরে। আর বর্তমান প্রেক্ষাপট হচ্ছে এর চূড়ান্তসীমা। সর্বশেষ পরস্থিতিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, সংকুচিত হয়েছে ওই জাতির ন্যায্য স্বাধীনতার স্বপ্ন। কিন্তু কেন? এর সহজ উত্তর আরব রাষ্ট্রসমূহের ব্যর্থতা। দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিবর্তনীয় নীতি। সাম্পদায়িকতাকে উসকে দিয়ে আরব রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বিভাজন ঘনীভূত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত প্রচেষ্টা আজ প্রায় সফল। এই প্রক্রিয়ায় একটি বৃহৎ ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইহুদিচক্র প্রণয়ন করে ইনন পরিকল্পনা। ইনন পরিকল্পনার অন্তর্গত বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে—লেবানন, লিবিয়া, ইরাককে ভেঙে খন্ড-বিখন্ড করা। আজকের ইরাক সংকট হচ্ছে ইনন পরিকল্পনার ফলাফল। ইরাক ও সিরিয়া সংকটের ভেতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনের সম্ভবনাও ওই চক্রান্তেরই অংশ। বস্তুত সিরিয়ার ভাঙনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের চ্যালেঞ্জ করার মতো আর কোনো শক্তি থাকবে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আজকের সংকটের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আইএস। আইএসের সঙ্গে মার্কিন সম্পৃক্ততার নিশ্চয়তা দেয় ইনন পরিকল্পনা। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—আইএসের কার্যকলাপও লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন পর্যন্ত সীমিত। লেভান্ট অঞ্চলে আইএস সফল হলে ইসরায়েলের সবচেয়ে কার্যকর হুমকি অ-আরবীয় রাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক শক্তি সক্ষমতা হ্র্রাস পাবে। এই লক্ষ্য পূরণে আইএস, ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একযোগে কাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর শক্তি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। মূলত আন্তঃআরব রাষ্ট্রীয় বিভাজন নিজেদের সম্মিলিত সামরিক শক্তির কৌশলগত দুর্বলতা প্রকট আকার নিয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যদিও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সাধারণ আরব সহানুভূতি বরাবরই ছিল। এই সহানুভূতি ভেস্তে দিতে নানা মার্কিন চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়েছে আরব নেতৃত্ব।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে তিনটি বৃহৎ যুদ্ধে হেরে আরবরা হতাশ। এখানেও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক সমর্থন আরবদের পরাজয়ের মূল কারণ। সমসাময়িক কালে মনোবল ভেঙে পড়া আরব দেশগুলোর চূড়ান্ত অধঃপতন সম্পন্ন করে মিসর। মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি আরব দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস ঘনীভূত করে। এ পর্যায়ে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে আরবদের সম্মিলিত শক্তির পুনরুত্থান সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পরে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের নতুন মাত্রায় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধযুদ্ধ। বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহায়তায় ইসরায়েলের সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়। এ সময় ইসরায়েলকে আশি বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সহায়তা দেয় মার্কিনিরা। এরমধ্যে হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে উচ্চপ্রযুক্তির ‘আয়রনডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

২০০৩ সালে বাগদাদের পতন আরব দেশগুলোর হতাশা আরো বাড়িয়ে দেয়। এ সময় আরবদের ইসরায়েলবিরোধী চেতনার কৌশলগত পরাজয় ঘটে। এরপর ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তর্কলহ প্রতিরোধযুদ্ধের গতিপথে একেবারে নিস্তেজ করে দেয়। এ সময় ফিলিস্তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হামাস সরকারকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয় পশ্চিমারা। আর আন্তর্জাতিক সম্পদায়ের এহেন তৎপরতায় বেকায়দায় পড়ে হামাস নেতৃত্ব। যদিও সে সময় বেশ কিছু দেশ বরাবরের মতো হামাসের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। তারপরও ইসরায়েল ২০০৮-০৯ সালে এক সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধযুদ্ধের মেরুদন্ড গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ছিল লক্ষণীয়। এ পর্যায়ে ফিলিস্তিনি জনগণের মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হয়। এরপর আবারো অপারেশন ক্লাউড পিলারে ১৬২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল। গত দুই বছরে আরো বেশ কয়েকবার ফিলিস্তিনে সামরিক আক্রমণ করে—সর্বশেষ সিরিয়া সংকটের জটিলতায় সেখানে আরো হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ করার মতো হচ্ছে—কয়েকদিন আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, পরবর্তী যুদ্ধই হবে ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের সর্বশেষ যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইতিহাসের অনিবার্যতা প্রমাণিত হবে বলেও তিনি হুংকার দেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ইঙ্গিত স্পষ্ট করে তোলে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ।

অথচ ’৪৮ সালের আগের ভৌগোলিক বাস্তবতা অনুসারে বর্তমানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত ভূমি মাত্র ৪ পয়েন্ট ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পশ্চিমতীরের নিয়ন্ত্রিত ভূমি হচ্ছে ২৭ শতাংশ, যা আবার খন্ড খন্ড পরস্পরবিচ্ছিন্ন। দেখা যাচ্ছে ’৪৭ সালের জাতিসংঘ বিভক্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূমির সবটুকুই ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। মূলত ইসরায়েল ’৪৮ সালের যুদ্ধে ’৭৮ ও ’৬৭ সালের যুদ্ধে ২২ শতাংশ ভূমি গ্রাস করে। নিজের ভূমি থেকে ক্রমাগত উৎখাত সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অবশিষ্ট ভূমি নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখত। কিন্তু সর্বগ্রাসী ইসরায়েল তাদের এতটুকু অধিকার মেনে নিতে অস্বীকার করছে। অথচ পিএলও ও ইসরায়েল পরস্পরকে মেনে নেওয়াসংক্রান্ত চুক্তি মতে বণ্টিত ভূমি হিসেবে পশ্চিমতীর, জেরিকো, গাজা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত। এই প্রেক্ষিতে তাবা ১৯৯৫ সালের মোতাবেক পশ্চিমতীরকেন্দ্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক পর্যায়ে এক করুণ অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ইতোমধ্যে এই সমস্যা সমাধানে রাশিয়া নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। অন্যদিকে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিন বিষয়ে ওয়াশিংটনের আগের নীতিই বহাল রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর ফিলিস্তিন বিষয়ে মার্কিন নীতির পরিবর্তন না হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান আপাতত সম্ভব হবে না। তাই এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে—বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনার মধ্যেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্ন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক