গতি হারিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর : বিপাকে ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৬, ১২:৪৫

কাজী আবুল মনসুর চট্টগ্রাম ব্যুরো
ADVERTISEMENT

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, কাজ পেতে নানা তদবিরসহ বিভিন্ন কারণে গতি হারাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। যার মাশুল দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে, পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। বন্দরে সৃষ্ট জাহাজ ও কন্টেইনার জটের কারণে তারা কড়া মাশুল গুনছেন। বন্দরে কাজের গতিশীলতা ধীর হওয়ার জন্য বন্দর ব্যবহারকারীদের দুষছেন কর্তৃপক্ষ। তবে পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন বন্দরে এ অবস্থা চলতে থাকলে তারা বড়ই মুশকিলে পড়বেন। আমদানি-রফতানির পণ্য খালাসে এখনই গতি আনতে না পারলে পোশাকশিল্পের ভবিষৎ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। মুখ থুবড়ে পড়বে পূর্বনির্ধারিত রফতানি লক্ষ্যমাত্রা। তবে পরিকল্পিতভাবে এ অবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা তা তদন্ত করতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

চট্টগ্রাম বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মঈনুদ্দিন আহমেদ মিন্টু বলেন, ‘হঠাৎ করেই বন্দরের নানা কর্মকান্ড নিয়ে পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা শঙ্কায় ভুগছেন। কারণ এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে রয়েছে যে সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আগে কন্টেইনার জাহাজ বহির্নোঙরে এলে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো না। এখন তা ১২ দিনে ঠেকেছে। ভেতরে পণ্য বোঝাই ও খালাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা লেগে আছে। মিন্টু বলেন, এখানে আসলে কি হচ্ছে, সমন্বয়ের কোন অভাব আছে কিনা বা অন্য কোনো নেপথ্য কারণ আছে কিনা তা বের করতে আমরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। এ সমস্যা সমাধানে নৌ-মন্ত্রীকে প্রধান করে বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটি খুব শিগগিরই এর কারণ খুঁজে বের করবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের আমদানি-রফতানি দিন দিন বাড়ছে। আসছে কাঁচামাল, যাচ্ছে তৈরি পোশাক। প্রতি বছর রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন ডলার এবং আগামী বছর সেটা ৩১ বিলিয়র ডলারের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক রফতানির ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ২০১৪-১৫ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার, ২০১৫-১৬ সালে হয়েছে ২৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। আগামী ২০২১ সালে ৫০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানির টার্গেট রয়েছে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ টাগের্টের কথা ইতিমধ্যে বলা হলেও বন্দরের সার্বিক অবস্থা নিয়ে তারা শঙ্কিত। কারণ বর্তমানে বন্দরে ভেতর ও বাইরে যে দুরাবস্থা চলছে তাতে পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের। এ অবস্থা চলতে থাকলে টার্গেট পূরণ তো দূরের কথা ব্যবসায়ীরা বাজার ধরে রাখতে পারবেন কিনা সংশয় দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গত তিন মাস ধরে বন্দরের ভেতরে চলছে কন্টেইনার জটজনিত সমস্যা। জাহাজ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার খালাস করতে না পারার কারণে তৈরি পোশাক ভর্তি কন্টেইনার আটকে যাচ্ছে। ঠিক সময় শিপমেন্ট হচ্ছে না। ফলে আর্থিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনারের ধারণক্ষমতা হচ্ছে ২৫ হাজার ৯৮১ টিইইউস। পাশাপাশি কন্টেইনার হস্তান্তর খালাসসহ বন্দর অভ্যন্তরে সার্বিক অপারেশনাল কর্মকান্ড স্বাভাবিক রাখতে হলে ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতার ৩০ শতাংশ জায়গা খালি রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমানে তা কোনভাবে করা যাচ্ছে না। বরাবরের মতো কন্টেইনারে ভর্তি থাকছে বন্দরের ইয়ার্ড। ফলে কন্টেইনারে নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় পণ্য রাখার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জরিমানা দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। তাছাড়া জটের কারণেই গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের কাঁচামাল হাতে পেতে বেশি সময় লাগছে। পণ্যভর্তি কন্টেইনার নিয়ে সাগরে জাহাজ অপেক্ষা করছে। ফলে পালাক্রমে জেটিতে ভেড়ানো এবং তা খালাস করে পণ্য বোঝাই করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। আর সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের রফতানি বাণিজ্যে।

বন্দরের এ অবস্থার পেছনে নেপথ্যে কারণ খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয় বেরিয়ে আসে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব। পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ সারানো হচ্ছে। যার ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এ গতি আসছে না। বন্দর কর্তৃপক্ষ যদিও গত তিন বছরে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছে। কিন্তু আসল যন্ত্র বলে পরিচিত ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’ এখনো কিনছে না। অথচ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর জন্য এটির কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৯টি জেটিতে জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জেসিবি) এ ১২টি, নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এ ৫টি, চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এ ২টি জাহাজ থেকে একসাথে পণ্য খালাস ও বোঝাই চলে। এগুলোর মধ্যে ৩১টি জেটিতে কন্টেইনার জাহাজের কাজ চলে। এর মধ্যে বড় অংশ জিসিবি’র কর্মকান্ড নিয়ে ব্যবসায়ীদের মাঝে অসন্তোষ চরমে। মূলত এ জিসিবি ঘিরে চলছে নানা অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, পুরানো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ চালালে দুর্নীতি বেশি হয়। প্রতি বছর যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে বন্দর-তহবিল থেকে চলে যায় ২৫ কোটি টাকা। ২৯৯টি বিভিন্ন ক্যাটাগরির যন্ত্রপাতি যেখানে প্রতিনিয়ত দরকার হয় সেখানে কাজ চালানোর জন্য আছে মাত্র ৮৭টি। জানা গেছে, কন্টেইনার জাহাজের জন্য ১৩টি জেটিতে ২৬টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেনের প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র ৪টি, ৫২টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রিক্রেনের প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র ১৯টি, ৩৯টি স্ট্রাডল ক্যারিয়ার থাকার কথা থাকলেও আছে ৩৬টি, ৩৯টি এম্পটি হ্যান্ডলার থাকার কথা থাকলেও আছে ১৯টি, ১৩টি পণ্যভর্তি কনটেইনার ওঠানামার রিচ স্টেকার থাকার কথা থাকলেও আছে ৯টি। যেসব যন্ত্রপাতি দিয়ে এখন বন্দর চলছে তাও পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এভাবে কোন বন্দও চলতে পারে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আর এ অবস্থার কারণে আজ বন্দরের এ হাল বলে ব্যবসায়ীরা জানায়।

তবে বন্দরের এ পরিস্থিতিকে পরিকল্পিত বলে আখ্যায়িত করেছেন সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, বন্দর ভিত্তিক মাফিয়া চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে ভয়াবহ কন্টেইনার এবং জাহাজ জটের মুখে পড়েছে। জাহাজের প্রলম্বিত অবস্থানের কারণে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন যা পক্ষান্তরে তারা সাধারণ ভোক্তার কাধেঁ চাপিয়ে দিচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বন্দর নির্ভর একটি মাফিয়া চক্র নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য দেশের আমদানি রফতানিকে জিম্মি করে ফেলেছে। তাদেও এই ষড়যন্ত্রের ফলে কোন প্রকার আর্ন্তজাতিক টেন্ডার ছাড়া অনেকটা জবর দখল করে বন্দর পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের দখলকৃত এনসিটি ব্যতীত অন্যান্য বার্থগুলোকে এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে ভয়াবহ কন্টেইনার এবং জাহাজ জটের মুখে পড়েছে। এ অব্যবস্থা এবং ষড়যন্ত্রের কারণে বিদেশী জাহাজ মালিকরা বাংলাদেশে জাহাজ পাঠাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে বা জাহাজ ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হবে।’

আরো জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি কন্টেইনার টার্মিনাল বেসরকারীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সাইফ পাওয়ার টেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদেরকে কাজ দেয়া এবং কাজের সময় বৃদ্ধি করার বিষয়ে নানা বির্তক রয়েছে। বন্দরের প্রায় অর্ধেকাংশ এ প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ উঠেছে এ প্রতিষ্ঠান পুরো বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর জন্য নানা রকম চক্রান্ত করছে। যার ফলে বন্দরের একাংশের গতি ধীর হয়ে গেছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক অবস্থা সর্ম্পকে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কথা স্বীকার করে বলেন, বন্দরের জন্য ১১২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে এসব যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ডিপিএম বা সরাসরি দর কষাকষির মাধ্যমে যন্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে অল্প সময়ে দাম,গুনগত মানের দিক সঠিকভাবে বুঝা যাবে। তিনি বলেন, অতীতে গ্যান্ট্রি ক্রেন কেন কেনা হয় নাই তা আমার জানা নেই, তবে বর্তমান বন্দরের প্রেক্ষাপটে এক মাসের মধ্যে এ ব্যাপারে অগ্রগতি হবে। জনবলের ব্যাপারে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫০০ জনবলের ঘাটতি আছে। তা ক্রমান্বয়ে পূরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে চলমান সঙ্কট সর্ম্পকে চেয়ারম্যান বলেন, ঘুর্ণিঝড় রোয়ানো ও ঈদের ছুটির কারণে কিছুটা জট সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এই সমস্যা দূর করতে ড্রাইডক জেটিতে জরুরি ভিত্তিতে জাহাজ বার্থিং দেয়া হচ্ছে, নাইট নেভিগেশনের জন্য পারমিজিবল লেন্থ ১৬৫ মিটার হতে ১৭০ এ উন্নিত করা হয়েছে, ১৫০০ খালি কন্টেইনার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ওভারফ্লো ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে, টার্ন এরাউন্ড টাইম নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে এবং নিয়মিত খালি কন্টেইনার জাহাজের মাধ্যমে শিপমেন্ট করা হচ্ছে।