বিশ্বায়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৬, ১২:০৯

চন্দন সরকার
ADVERTISEMENT

‘পুওরার দ্যান দেয়ার প্যারেন্টস? ফ্ল্যাট অর ফলিং ইনকামস ইন অ্যাডভান্সড ইকোনমিকস’ শিরোনামে গত জুলাইয়ে ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট স্নায়ুতে ধাক্কা দেওয়ার মতো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে গত ১৯৯০ সালের পর থেকে বিশেষ করে গত এক দশকে উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাপন যে উল্লেখযোগ্যভাবে অধঃপতিত হয়েছে তার বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি করা হয়েছে নির্বাচিত ২৫টি উন্নত দেশের জনগণের আয়ের বণ্টনভিত্তিক উপাত্তনির্ভর সমীক্ষার ভিত্তিতে। ফ্রান্স, ইতালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের ওপর এই সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়। এছাড়াও ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৬০০০ জনের আয় সম্পর্কিত ধারণারও একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এই সমীক্ষা দুটির ফলাফলে দেখা যায়, ২৫টি উন্নত অর্থনীতির দেশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পরিবারের (প্রায় ৫৪ থেকে ৫৮ কোটি মানুষ) ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আয় ক্রমাগত কমেছে। অন্যদিকে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়ে আয় হ্রাস পাওয়া পরিবারের অংশ ছিল মাত্র ২ শতাংশ বা এক কোটি মানুষেরও কম। অর্থাৎ বিশ্বায়ন তথা বাজার অর্থনীতি চালুর পর উন্নত বিশ্বের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ধনবৈষম্যের বিস্তৃতি ঘটেছে।

সমীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী বিশেষ নির্দিষ্ট কিছু দেশের পরিস্থিতি অনেক বেশি অবনতিশীল। দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ইতালির ৯৭ শতাংশ মানুষের আয় হয় একই জায়গায় স্থির রয়েছে অথবা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এই হার হচ্ছে যথাক্রমে ৮১ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ। তবে যে ২৫টি দেশের ওপর সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়েছে সেসব দেশের গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষের আয় হয় একই জায়গায় স্থির রয়েছে অথবা হ্রাস পেয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণভাবে বেতন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়তো আয় বেড়েছে, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) এবং পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে। দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজারদরের ভিত্তিতে কম করেও ৮১ শতাংশ পরিবারের আয় হ্রাস পেয়েছে। সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত ২৫টি দেশের মধ্যে একমাত্র সুইডেন ছাড়া সব দেশেরই অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। বরং নানা ধরনের করের বোঝা চাপিয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস করা হয়েছে। এতে শ্রম বাজারে এবং শ্রমিকদের মাঝে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। আর এই পরিস্থিতি বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই।

ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট পরিচালিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী এই পরিবর্তনের ধারায় কম শিক্ষিত বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণ এবং নারীদের মধ্যে স্বামী পরিত্যক্তা মায়েরা সবচেয়ে বেশি আয় বৈষম্যের শিকার। উন্নত বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম তাদের পিতাদের চেয়ে দরিদ্র হওয়ার এই মারাত্মক প্রবণতার ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, তারা বরং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বাস্তবতাটি সাধারণভাবেই প্রচলিত এবং সমীক্ষায় প্রতিফলিত। ২০১৫ সালে ব্রিটিশ, ফরাসী ও মার্কিন নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দেখা যায় সমীক্ষাধীন প্রায় ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এখানে উল্লেখ করার বিষয় এই যে, এ ধরনের পরিস্থিতি যারা মোকাবিলা করছে তারা আগামী প্রজন্মেও যে এর উন্নতি ঘটবে এমনটি আশা করে না। এছাড়াও এরা বর্তমান বাণিজ্য ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগের ব্যাপারেও অত্যন্ত অসন্তুষ্ট বলে জানায়। তারা মনে করে, ‘বিদেশি পণ্য ও সেবার জোয়ারে তাদের অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজার হাতছাড়া হচ্ছে এবং বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াও তাদের সংস্কৃতি ও সমাজকে ভঙ্গুর করে তুলছে।’ এ ধরনের হতাশায় যারা ভুগছে তারাই মূলত এসব উন্নত দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। এরাই ফ্রান্সে ফ্রন্ট ন্যাশনাল কিংবা ব্রিটেনে ব্রেক্সিটের মতো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমরা ৯৯ শতাংশ’ আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন।

উন্নত দেশগুলোতে শ্রমবাজারের এই পরিস্থিতি এবং মজুরি হারের অবনয়নের কারণ হিসেবে সরকারি নীতিমালা ও শ্রমবাজারের নতুন এই ব্যবস্থাকেই দায়ী করে সেখানকার শ্রমিকরা। তারা মনে করে এজন্যই তাদের মজুরির প্রাপ্য অংশ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ম্যাককিনসে প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের মিলিত মজুরি থেকে গড়ে এসব দেশের শ্রমিকরা ৫ শতাংশ হারে কম মজুরি পাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের প্রাপ্য ন্যায্য মজুরি থেকে ৫ শতাংশ মজুরি হারাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক। এখানকার শ্রমিকরা ১৩ শতাংশ হারে মজুরি হারাচ্ছে অথবা মজুরির অংশীদারিত্ব থেকে ১৩ শতাংশ হারে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ উৎপাদনের শ্রম ক্ষমতা বাড়ছে অথবা উৎপাদন বাড়ছে। তারপরও এমনটি কেন হচ্ছে? এর কারণ অপেক্ষাকৃত সস্তা শ্রমে অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগ করে মুনাফার অংশটা মালিকরা তাদের পকেটস্থ করছে।

এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বিশ্বায়ন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। সেই সঙ্গে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কম মজুরিতে কাজ সারা হচ্ছে। এরপরও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের মাধ্যমে মজুরি আয়ের অংশীদারিত্ব অভ্যন্তরীণ শ্রমিকদের জন্য কিছুটা হলেও সুবিধা এনে দেওয়া যায়। যেমন সুইডেন এমন ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের উচ্চ আয় ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে মজুরি আহরণের ফারাক কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু যেসব দেশ পার্টটাইম ও অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক শ্রমনীতি নিয়েছে তাদের শ্রমিকদের মজুরি প্রাপ্তির অংশীদারিত্ব হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে এর বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে তরুণদের ওপর। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সরকারি উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর ২৮টি সদস্য রাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ তরুণ শ্রমিক (যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে) কম মজুরিতে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে এবং তারা চাকরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ফ্রান্সে এই হার ৫৮ শতাংশ এবং স্পেনে ৬৫ শতাংশ। ইউরোজোনের ১৮টি দেশের গড় হার প্রায় ৫০ শতাংশ।

পরিস্থিতিটি অপেক্ষাকৃত তরুণদের জন্য অবশ্যই শঙ্কার কারণ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষেপিয়ে তুলেছে এসব তরুণের বাবা-মাকে। কারণ তারা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত এবং সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে এর বিপরীতে তারা দেখছে ধনী দেশগুলোর অধিকাংশের মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে লুটপাটতন্ত্রকে সহায়তা জুগিয়ে চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১০-১৪ সময়ে কোম্পানি বা ফার্মগুলোর কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে জিডিপির ১০ শতাংশেরও বেশি, যা ৩০-এর দশকের মহামন্দার প্রাক মুহূর্তে ১৯২৯ সালের সমপর্যায়ের। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই প্রক্রিয়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো লোকদের রাজনৈতিক উত্থানে সহায়তা করছে। কারণ তারাই এই লুটপাটতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী।

এ থেকে স্পষ্ট যে, এ ধরনের অর্থনৈতিক নীতিামালার অধীনে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। বরং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকেই যাবে। আগামী এক দশক সময়ে অর্থাৎ ২০২৫ সাল নাগাদ আয় হ্রাস পাওয়া পরিবারের হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অন্তত পরিসংখ্যানগত গ্রাফ সে কথাই বলেÑএমন ধারণা দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এ ধরনের ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা ভবিষ্যৎই কেবল বলতে পারে। আর এই ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য ও প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি এবং এর প্রভাবে ধনী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভঙ্গুরতাকে তারা নিজেদের বিশ্বায়নের শিকার বলেই মনে করে।

লেখক : সাংবাদিক