জাপানে রবীন্দ্রনাথের দুর্লভ স্মৃতি

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৬, ১১:৪০

প্রবীর বিকাশ সরকার
ADVERTISEMENT

২০১১ সালের কথা। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম টোকিওর শিবুইয়া শহরের বিখ্যাত টোবাকো এবং সল্ট মিউজিয়ামে ২৩ সেপ্টেম্বর। অনুষ্ঠানে জাপানে গৃহীত রবীন্দ্রনাথের ৩০টিরও বেশি দুর্লভ আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়।

এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কাম্পো আরাই-এর দৌহিত্র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সার্ধশতবর্ষ স্মারক কমিটির প্রধান পরিচালক ৎসুতোমু কাওয়াই। ‘টেগোর এবং কাম্পো আরাই : য়োরোবোশির সঙ্গে সংযোগ’-শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি কীভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানি চিত্রকলায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, জাপানি শিল্পকলার পদ্ধতি বাংলা অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, সেসব ঘটনার সুচারু বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগ্রহের প্রতি সম্মান জানিয়ে তৎকালীন শিল্পকলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক শিল্পপতি হারা তোমিতারোও তথা হারা সানকেই কীভাবে চিত্রশিল্পী কাম্পো আরাইসহ একাধিক তরুণ চিত্রশিল্পীকে ভারতে পাঠান সেই সব কাহিনিও রয়েছে। তারা কলকাতার জোড়াসাঁকোস্থ ঠাকুরবাড়িতে অবস্থিত বিচিত্রাভবনে গগনেন্দ্র, অবনীন্দ্র, নন্দলাল বসু, ধীরেন দেব বর্মণ, অসিত হালদার, মুকুল দে, বিনোদবিহারী প্রমুখের সঙ্গে কীভাবে মতবিনিময় করে শিক্ষার আদান-প্রদান ঘটিয়েছেন তারও বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘হারা সানকেই-এর বাগান বাড়ি সানকেইএন-এ ১৯১৬ সালে তিন মাস অবস্থানকালে সেখানকার চিত্রকলার জাদুঘরে রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই যেতেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চিত্রকর্মগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতেন। সেখানেই বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শিমোমুরা কানজান অঙ্কিত বিশাল চিত্রকর্ম ‘য়োরোবোশি’ বা ‘অন্ধভিক্ষুর সূর্যবন্দনা’ দেখে রবীন্দ্রনাথ অভিভূত হয়ে পড়েন! এই চিত্রটি স্বদেশে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে হারা তোমিতারোওর অনুরোধে কাম্পো আরাই অবিকল নকল করে ছবি এঁকে দেন। কাম্পোর এই নিখুঁত কাজ দেখে বিস্মিত হন রবীন্দ্রনাথ। ভারতে প্রায় দু’বছর (১৯১৬-১৮) অবস্থানকালে তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯২৬ সালেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইতালির রোমে সাক্ষাৎ ঘটে কাম্পোর। কাম্পো-রবীন্দ্র সম্পর্কের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে কাম্পো অঙ্কিত রবীন্দ্র প্রতিকৃতি এবং রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক কাম্পোকে উৎসর্গিত একটি অসাধারণ বাণী আজও দুদেশের মানুষকে আন্দোলিত করে চলেছে।’

দ্বিতীয় বক্তৃতা ছিলেন প্রসিদ্ধ রিক্কিয়োও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. মাসাতোশি কোনিশি। তিনি ‘ঠাকুর পরিবার এবং ভারতের আধুনিক শিল্পকলার প্রতিষ্ঠা’ বিষয় নিয়ে ঘণ্টাধিক আলোচনা করেন। মুঘল যুগের মিনিয়েচার, কালীঘাটের পটচিত্র থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলাচর্চা পর্যন্ত দীর্ঘ বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। ব্রিটিশ বণিক তথা শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে ‘কোম্পানি আর্ট’ জন্ম নেয় তার সরস বর্ণনা দেন। কোম্পানি আর্ট থেকে লৌকিক দেবদেবীকেন্দ্রিক চিত্রকলার জন্ম দেন পাঞ্জাবের শিল্পী রবি ভর্মা, সেই ইতিহাস সবাইকে চমৎকৃত করে। বিংশ শতকে এসে পাশ্চাত্য শিল্পকলার প্রভাবে কিউবিজম অনুকরণে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক চিত্রকলার সূচনা করেন। একই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু বাংলার লৌকিক ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন ধারার ‘বেঙ্গল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেনÑযা ছিল ক্ষণকালীন বাংলার নবজাগরণের অঙ্গীভূত। অধ্যাপক কোনিশি রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্কনকে ভারতীয় চিত্রকলার জগতে অভিনব বলে অভিহিত করেন, বিশেষ করে তার পা-ুলিপির অক্ষর-আলঙ্কারিক চিত্রকলাকে। তবে মন্তব্য করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব চিত্রকর্মই অনুজ্জ্বল দু-একটি বাদ দিলে। জাপানি চিত্রকলার পদ্ধতি যথাক্রমে ওয়াশ এবং মোওরোওতাই বা ধোঁয়াটে রঙের প্রভাবও কিছুটা কোনো কোনো ভারতীয় শিল্পীর চিত্রকর্মে বিদ্যমান। তবে কোনো ধারাই বাংলায় স্থায়িত্ব লাভ করেনি।’

অধ্যাপক কোনিশির গবেষণাধর্মী মন্তব্য যে আদৌ মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ বাংলা চিত্রকলার কোনো ধারা বা ঘরানা আজ আর নেই। কী কালীঘাটের পটচিত্র, মুঘল মিনিয়েচার, ধর্মীয় চিত্রকলা, অবনীন্দ্র-নন্দলাল-যামিনী কিংবা রবীন্দ্রধারা কোনোটাই টিকেনি। কাজেই বলা যায়, ঐতিহ্যলুপ্ত আজকের বাংলার চিত্রকলা। কিন্তু জাপানি ‘নিহোনগা’ বা ‘ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলা’ আজও বহাল তবিয়তে টিকে আছে। নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে জাপানব্যাপী। ফলে জাপানিরা আজও ‘নিহোনগা’র অনুরাগী। অন্যদিকে একদা ইতিহাস সৃষ্টিকারী বাংলা চিত্রকলার নিয়মিত প্রদর্শনী হয় না বলেই আমরা বিস্মৃত সেই ইতিহাস। অধ্যাপক কোনিশি বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস গবেষণা করে যে চমৎকার সচিত্র তথ্য তুলে ধরেছেন তা জাপানি সমাজে ব্যতিক্রমই বটে।

অভূতপূর্ব ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে এই অনুষ্ঠানে বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব এবং আধুনিক জাপানের প্রথম যুগের জুদো প্রশিক্ষক সানো জিননোসুকের ৯৪ বছর বয়স্ক কন্যা শ্রীমতী কুরোকাওয়া কিয়োর উপস্থিতি। ক্রীড়াবিদ সানো ১৯০৫-৮ সাল পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে জুদো শিখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে প-িত ও শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন তাকে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। সানো বাংলা ভাষা শিখেছিলেন এবং লেখালেখিতেও দক্ষ ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’র জাপানি অনুবাদ, ১৯২৫ সালে এটা জাপানে প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ সালেই রবীন্দ্রনাথ এই অনুবাদের কাজ প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে ধারণা করা যায় । কারণ এই সালে জাপানে তিনি তৃতীয়বারের মতো ভ্রমণ করেন। কুরোকাওয়া কিয়ো তার পিতা সম্পর্কে দু-একটি কথা বলেন। ‘গোরা’ উপন্যাসটির কথা তার স্মরণে আছে ভালোভাবেই। এছাড়া বাঙালি ও জাপানিদের ভাববিনিময় নিয়েও তার ঠাকুরদা একটি গ্রন্থ লিখেছেন যা ‘গোরা’র মতোই দুষ্প্রাপ্য। ‘গোরা’ গ্রন্থটি তাকে দেখালে তিনি হাসতে হাসতে আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি এটা জিনবোচো শহরের পুরনো গ্রন্থবিতান কিতাজাওয়া শোতেন থেকে কিনেছ?’ আমি অবাক হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

তিনি বললেন, ‘আমিও একবার কিনতে গিয়েছিলাম ওটা তখন দাম ছিল ৪,০০০ ইয়েন, অতিরিক্ত ভেবে কেনা হয়নি। আমাদের সংগ্রহে বইটি নেই তো! বইটি সত্যি এখন খুবই দু®প্রাপ্য। তুমি সৌভাগ্যবান।’

সত্যিই তাই, গ্রন্থটি আমি ১,৫০০ ইয়েন দিয়ে জুলাই মাসের শেষ দিকে কিনেছি। তিনি গ্রন্থটি হাতে নিলে পরে আমি ছবি তুলে রাখলাম একটি বিরল স্মৃতি হিসেবে।

এবারের অনুষ্ঠানটি দুটি কারণে আমার কাছে বিরল মনে হয়েছে। প্রথমত, মাদাম কেইকো আজুমার হাতে আমার সদ্য প্রকাশিত ইংরেজি ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর : ইন্ডিয়া-জাপান কোঅপারেশন পার্সপেক্টভিস’ গ্রন্থটি উপহার হিসেবে দিতে পেরেছি মঞ্চে উঠে। অবশ্য গ্রন্থটি আজুমা দম্পতিকে উৎসর্গ করার প্রয়াস পেয়েছি আমাকে দীর্ঘদিন তারা যেভাবে পুত্রবৎ স্নেহ ও ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন তার মূল্যায়নস্বরূপ।

দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের বন্ধু সানো জিননোসুকের কন্যার সঙ্গে অভাবনীয় সাক্ষাৎ, যা জীবনে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এভাবেই অকস্মাৎ মানুষকে ঋদ্ধ করে দেন বলে মনে হলো।