বিল ক্লিনটন-হিলারি ও অন্যান্য ভালোবাসার গল্প

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৬, ১৩:১১ | আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৬, ১৫:০১

রুবাইয়া হাসনাত বর্ণা
ADVERTISEMENT

আমেরিকার ৪২তম রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছেন হিলারির রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিযোগিতার কারণে । আমেরিকার নির্বাচন শুরু হবে খুব শীঘ্রই । এটা খুব সহজে বলা যাচ্ছে না নির্বাচনে কোন প্রার্থী জিতবেন । তবে বিল ক্লিনটনের স্ত্রী হিসেবে বেশি পরিচিত হিলারি আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ।

রাষ্ট্রপতি বিল তার শাসনকালে তার সহনশীল নীতিমালার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন । তার সময়কালীন তিনি এমন কিছু নীতিমালা আমেরিকায় প্রণয়ন করেন যা সে দেশের উন্নয়ন কাজকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে । কিন্তু তার এই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে ক্ষমতায় থাকাকালীন নারীদের সাথে সম্পৃক্ত বেশ কিছু স্ক্যান্ডালের কারণে ।

ব্যাক্তিগত জীবনে হিলারির সঙ্গে বিলের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ও রোমান্টিক ছিলো । বিলের সাথে হিলারির প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনা অনেকটা রোমান্টিক সিনেমার মতো। ১৯৭১ সালে ক্লিনটন যখন ইয়েল ল স্কুল এ জুরিস ডক্টর ডিগ্রী নিতে যান তখন হিলারির সাথে পরিচয় হয় । হিলারি সেখানে আইনের উপর স্নাতক ডিগ্রী নিচ্ছিলেন । স্কুলের লাইব্রেরিতে তাদের প্রথম দেখা হয় । হিলারির ভাষায়, সে আমার দিকে তাকিয়েই ছিলো । অনেক্ষণ ধরে সে এটাই করছিলো । এভাবে কিছুক্ষণ চলে তাকাতাকি খেলা । এরপর আমি চেয়ার থেকে উঠে সোজা বিলের কাছে যেয়ে বলি, তুমি যদি এভাবে আমার দিকে তাকিয়েই থাকো আমিও একই কাজ করবো । তার চেয়ে বরং পরিচিত হওয়া যাক । আমি হিলারি রডহ্যাম । বিলের ভাষায় সে ঐ মুহূর্তে নিজের নাম মনে করতে পারছিলো না।

হিলারি যখন তার গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন তখন ক্লিনটনের সাথে ইউরোপ ভ্রমণে যান । তারা দুইজন লন্ডনে একসাথে বিমান থেকে নামেন এবং সম্পূর্ণ লন্ডন শহর বিল তাকে ঘুরিয়ে দেখান । দিনশেষে তারা নিজেদের আবিষ্কার করেন লেক এনারডেলের পাড়ে । বিল তাকে সেখানেই তার মনের ইচ্ছা জানান । হিলারি বলেন, আমি বিলের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম । কিন্তু আমার জীবন ও ভবিষ্যত নিয়ে আমি তখন অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম । তাই আমি তাকে বলি, না এখন না । আসলে আমি তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম আমাকে কিছু সময় দাও । এরপর পরবর্তী সময়গুলোতে ক্লিনটন তাকে বহুবার প্রস্তাব দের কিন্তু সাবেক ফার্স্ট লেডি প্রতিবারই নাকচ করে দেন ।

স্কুল শেষে হিলারি আরকানসাসে চলে যান । মূল উদ্দেশ্য ছিলো তার নিজের বাড়িতে ঘুরে আসা আর বন্ধুদের বাড়িতে কিছুদিন থেকে আসা । এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লাল ইটের একটি বাড়ি দেখে হিলারি বলে ওঠেন, এই ছোট বাড়িটা দেখতে অনেক সুন্দর, এই বাড়িতে থাকার সুযোগ পেলে দ্বিতীয়বার চিন্তা করবো না । কয়েক সপ্তাহ পর যখন আমি আরকানসাস থেকে ফিরে আসি তখন বিল আমাকে সেই বাড়ির সামনে নিয়ে যায় এবং বলে, মনে আছে এই বাড়ির কথা? তোমার খুব পছন্দ ছিলো । আমি বাড়িটি কিনেছি এবং বাড়িতে আমি একা থাকতে চাই না । আমি চাই তুমি আমাকে বিয়ে করো । তখন আমি নিজেকে আর আটকাতে পারিনি । আমি তাকে হ্যা বলে দেই । ১৯৭৫ সালের ১১ অক্টোবর আমাদের নতুন বাড়ির লিভিং রুমে মাত্র ১৫ জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে আমাদের বিয়ে হয় ।  পরবর্তীতে বাড়িটির পেছনে আমাদের রিসেপশনের আয়োজন করি যেখানে প্রায় ১০০ জন মানুষকে দাওয়াত করা হয় ।

বিবাহ জীবন খুব সুখেই কাটছিলো ক্লিনটনের । কিন্তু ১৯৯৮ সালে উঠে আসা পাওলা জোনস ও মনিকা লিউনস্কির সাথে স্ক্যান্ডাল তাদের বিবাহ জীবনে ঝড় তোলে । এসময় অনেক নারীই দাবি করতে থাকে যে তাদের সাথে বিলের সম্পর্ক ছিলো । এর মাঝে কিছু নারী বলেন যে বিল তাদের কে যৌন নিপীড়ন করেছিলো ।  এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি । তবে ক্লিনটন শুধুমাত্র মনিকা লিউনস্কি ও জেনিফার ফ্লাওয়ারের সাথে তার সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন ।

মনিকা লিউনস্কি হোয়াইট হাউসে ইনটার্ন হিসেবে ছিলেন । মনিকার ভাষায়, ক্লিনটনকে আমার ভালো লাগতো । কথাটি যেদিন আমি ক্লিনটনকে বলি তিনি আমাকে অফিসের পেছনে দেখা করতে বলেন । এভাবে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে । অফিসের সবার চোখে পড়তে থাকে আমাদের ঘনিষ্ঠতা । মনিকা বলেন, প্রায় নয়বার আমাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয় ।

পরবর্তীতে লিউনস্কি পেন্টাগনে বদলী হলে তার সহকর্মী লিন্ডা ট্রিপকে বিষয়টি গোপনে বলেন । ১৯৯৮ সালে যখন পাওলা জোনসের মামলা শুরু হয় তখন লিন্ডা দেখেন ক্লিনটনের সম্পর্কের বিষয়গুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে । পাওলার মামলা থামানোর জন্য ক্লিনটন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন । পাওলার অভিযোগ ছিলো ১৯৯১ সালে আরকানসাসে তাকে বিলের সাথে যৌন সম্পর্কে মিলিত হতে বাধ্য করা হয় ।

লিন্ডা তখন মনিকার সাথে বিলের ফোনালাপ রেকর্ড করেন, মনিকাকে তার নীল পোশাক পরিষ্কার করতে মানা করেন যেখানে বিলের ডিএনএর নমুনা ছিলো । প্রথমে মনিকা রাজি হন নি কিন্তু পরবর্তীতে পাওলাকে হেরে যেতে দেখে তিনি রাজি হন । যখন মনিকা লিউনস্কির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসে বিল অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন । কিন্তু যখন জোরালো প্রমাণ এনে হাজির করা হতে থাকে, অবশেষে তিনি তাদের সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করেন । তিনি বলেন, এটা আসলে আমার করা উচিত হয়নি । এটা আমার ভুল ছিলো । আমি বিষয়টি নিয়ে অনুতপ্ত ।

আমেরিকান মডেল জেনিফার ফ্লাওয়ারের সাথে তিনি যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন সেটিও স্বীকার করেন । হিলারি পুরো বিষয়টিতে অত্যন্ত মর্মাহত হন । আবার সাথে সাথেই তিনি সামলে ওঠেন । বিলের সাথে তিনি এক বছর পর্যন্ত কথা বন্ধ রেখেছিলেন যা মাই লাইফে বিল উল্লেখ করেন । মনিকার সাথে স্ক্যান্ডালের বিষয় ক্লিনটনকে অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয় । যেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি খালাস পান । ২০০০ সালে তিনি যখন পরিবারকে নিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়েন তখন সবাই ধারণা করেছিলেন হিলারির সাথে ক্লিনটনের ডিভোর্স হয়ে যাবে । যা পরবর্তীতে হয়নি । ক্লিনটনের এই স্ক্যান্ডাল নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির ফলাফলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলো । ফলে প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী দৌড়ে হিলারি বিলকে রেখেছেন পর্দার আড়ালে । যদিও সম্প্রতি বিলকে ক্যামেরার সামনে দেখা যাচ্ছে ।

বিলের বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কের বিষয়ে জানার পরও হিলারি কেন ক্লিনটনের সাথে এখনও আছেন তা অনেকেরই প্রশ্ন । অনেকে বলছেন নির্বাচনী দৌড়ে টিকে থাকার জন্য এবং ক্ষমতার অধিকারি হওয়ার জন্য তিনি এখনও বিলের সাথে আছেন । আবার অনেকে বলেন ক্লিনটন তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন । হিলারিও সেটি ধরতে পেরেছিলেন । ক্লিনটনের প্রতি তার সত্যিকার ভালোবাসার কারণে তিনি এই সম্পর্কে থেকে গিয়েছিলেন ।

ক্লিনটনের সাথে তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কারণ যাই হোক তাদের মধ্যে রোমান্স যে এখনও আছে তা ভালোভাবেই বোঝা গিয়েছিলো ২০০৯ সালে এক কফি শপে । সেখানে তাদের দুইজনকে একত্রে ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় ।

নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি মেইল, দ্য নট এবং উইকে পিডিয়া অবলম্বনে - রুবাইয়া হাসনাত বর্ণা