ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ ও তার নারী সঙ্গীরা

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৬, ১৯:২৪ | আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৬, ১৯:৪৫

রুবাইয়া হাসনাত বর্ণা
ADVERTISEMENT

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্র সামলানো নিয়ে নয় বরং সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন তার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিন নারীর সঙ্গ তাকে বার বার নিয়ে এসেছে স্পটলাইটের নিচে। অবিবাহিত থাকা অবস্থায় নারীদের সঙ্গ তার রাজনৈতিক জীবনেও অনেক প্রভাব ফেলেছে। ফরাসি মিডিয়া সবসময় তাকে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছে। যতবারই তিনি মিডিয়ার সামনে এসেছেন ততোবারই তাকে শুনতে হয়েছে ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে কোনও না কোনও প্রশ্ন।

এক নারীর সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অন্য নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনায় তুমুলভাবে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যখন তিনি সফলতার তুঙ্গে তখন তার বারবার এই নারীসঙ্গ বদলানোর বিষয়টি সবার চোখে পড়েছে। সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর জীবনযাপন করেছেন তিনি সেগোলিনি রয়্যাল এর সাথে কিন্তু তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। এরপর তিনি সাংবাদিক ভ্যালোরি ট্রিরওয়েলিয়ারের সাথে সম্পর্কে জড়ান। ভ্যালোরির সাথে সম্পর্কে থাকা অবস্থায়  ফরাসি অভিনেত্রী জুলি গায়েট এর সাথে সম্পর্ক থাকার গুন্জন ওঠে এবং ২০১৪ সালে তিনি ভ্যালোরির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এরপর জুলির সাথে তার সম্পর্ক আছে কি নেই এই বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু জানাননি। ফরাসি মিডিয়ার ভাষায় সম্পর্কাট নিয়ে তিনি লুকোচুরি খেলছেন সবার সামনে। তার এই দীর্ঘ দুই বছরে কোন সম্পর্কে না জড়ানো ভালো চোখেও দেখছে না মিডিয়া। বিশেষ করে ২০১৪ সালে প্রথম সঙ্গী রয়্যালকে তার মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করাতে মিডিয়া সন্দেহ করছে পুরনো প্রেম কি তবে জাগ্রত হলো?

তার পূর্বসুরী নিকোলাস এর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যেমন মিডিয়া মেতে থাকতো তেমনই ফ্রাঁসোয়ার বারবার নারীসঙ্গ পরিবর্তন করা বিষয়টি মিডিয়ার খোরাক জোগাচ্ছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক ফ্রাঁসোয়ার জীবনে আসা এই নারীদের সম্পর্কে।

সেগোলিনি রয়্যাল:

রয়্যাল ফরাসী রাজনীতিবিদ যিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন ২০০৭ সালে এবং বর্তমানে শক্তি ও পরিবেশ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রয়্যালের ঘরে ওঁলাদের ৪ সন্তান রয়েছে। যদিও তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি তারপরও প্রায় তিন দশক একসঙ্গে ছিলেন।

তাদের দুইজনের দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি করার সময়। দুইজনেই তখন মনে মনে দেশের সর্বোচ্চ পদের অধিকারি হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। ২০০৭ সালে রয়্যাল সারকোজির বিপরীতে প্রেসিডেন্ট পদে ফ্রান্সের প্রথম নারী প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে দাঁড়ান। কিন্তু তিনি হেরে যান। এবং এর পরেই তিনি ওঁলাদের কাছ থেকে আলাদা থাকা শুরু করেন।

২০১২ সালে একবার তিনি ওঁলাদের মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ওঁলাদের তৎকালীন সঙ্গী ভ্যালোরির আপত্তির জন্য তিনি বাধ্য হন মন্ত্রীসভা ছাড়তে। এরপর তিনি ২০১৪ সালে পুনরায় মন্ত্রীসভায় যুক্ত হন। তখন তাদের দুইজনকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একত্রে দেখা যায়। ফরাসি মিডিয়ার পুনরায় প্রশ্ন তোলে তবে কি পুরানো সম্পর্কেই ফিরছেন ওঁলাদ? তবে একথার শক্ত জবাব দেন রয়্যাল। দলের স্বার্থগত প্রয়োজনেই তাদেরকে একত্রে দেখা যাচ্ছে। পুরানো প্রেম নয়।

ভ্যালেরি ট্রিরওয়েলিয়ার:

ভ্যালেরি সাথে ওঁলাদ সম্পর্কে জড়ান ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে। সেসময় ওঁলাদের সাথে ভ্যালেরির সাথে সম্পর্ক থাকার গুঞ্জন বাতাসে ভাসতে থাকলেও তারা সবার সামনে স্বীকার করেননি। একই বছরের নভেম্বরে ভ্যালেরি মিডিয়ার সামনে তাদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে তাদের সম্পর্ক যে রয়্যালের সাথে সম্পর্ক ভাঙ্গনের পরেই জুড়েছে একথাও উল্লেখ করেন।

ভ্যালেরি প্যারিস ম্যাচ ম্যাগজিনে কাজ করতেন একই সাথে ফরাসি টেলিভিশনে আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টার হিসেবে তাকে দেখা যেতো। ওঁলাদের সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর তিনি তার তখনকার স্বামীকে ডিভোর্স দেন এবং তিন সন্তানকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবন এলাইসিতে ওঠেন।

২০১২ সালে রয়্যালকে মন্ত্রীসভার অন্তর্ভূক্ত করার বিষয় নিয়ে তিনি আপত্তি তোলেন। ফলে রয়্যাল মন্ত্রীসভা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এতে তিক্ততা প্রকাশ করে ওঁলাদের প্রথম সন্তান টমাস বলেন যে তিনি এবং তার ভাইবোনেরা ভ্যালেরিকে ফার্স্ট লেডি হিসেবে দেখতে চান না। পরবর্তীতে টুইটারে বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চান ভ্যালেরি।

ভ্যালেরির সাথে ভারত সফরের সময় ওঁলাদ সমস্যায় পড়েন। বিবাহ ছাড়া তাদের এই সম্পর্ক ভারতে অবৈধ এবং তারা যদি ভারতে প্রবেশ করেন তবে অপবিত্র হয়ে পড়বে তাদের ভূমি। এজন্য ভারতের জনগণ আন্দোলনে নামে। সেসময় সারকোজির স্ত্রী কার্লা ভ্যালেরিকে পরামর্শ দেন তিনি যেন ওঁলাদকে বিয়ে করেন।

এরপর ২০১৪ সালে জুলির সাথে ওঁলাদের সম্পর্কের গুঞ্জন উঠলে ভ্যালেরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকেই ধারণা করেন যে তিনি আসলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও বিশ্বস্ত ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় যে তিনি আসলে একই ওষুধ বেশি সেবন করেছিলেন। কিন্তু এমন ভুল কেন হলো তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি। ২০১৪ সালেই ওঁলাদ তাদের বিচ্ছেদের সংবাদ মিডিয়ার সামনে জানান। ওঁলাদের প্রতি তারপরও যে তার অনুভূতি একটুও কমেনি তা জানা যায় তার পরবর্তী বক্তব্যে। যেখানে তিনি ওঁলাদকে কোনও দোষারোপ করেননি। তার অসুস্থতার সময় ওঁলাদ ফুল ও চকলেট পাঠিয়েছেন একথাও উল্লেখ করেন।

জুলি গায়েট:

জুলি গায়েট ফ্রান্সের স্বনামধন্য অভিনেত্রী। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি পরিচিত না হলেও ফ্রান্সের সিনেমাজগতে তার মোটামুটি সুখ্যাতি আছে। ৪১ বছর বয়সী এই অভিনেত্রীকে ওঁলাদের প্রেসিডেন্ট পদের প্রচারণা বিজ্ঞাপনেও দেখা যায়। ২০১৪ সালে ফরাসি এক ম্যাগজিনে প্রকাশিত এক ছবির জন্য ওঁলাদ ও তার সম্পর্ক আলোচনার টেবিলে উঠে আসে। ছবিতে দেখা যায় ওঁলাদ প্যারিসে তার অন্য এ্যাপার্টমেন্টে স্কুটারে বসে হেলমেট দিয়ে মুখ ঢেকে এসেছেন। এই এ্যাপার্টমেন্টেই তিনি জুলির সাথে দেখা করতেন বলে ধারণা করা হয়। এই গুঞ্জনকে ওঁলাদ গুজব বলে উড়িয়ে দেননি। সবার সামনে তিনি সম্পর্ক নিয়ে কোনও বক্তব্যও দেননি। ধারণা করা হয় ফরাসি এই অভিনেত্রীর সাথে তিনি এখনও আছেন। ফরাসি মিডিয়ার মতে এতোদিনে তিনি যোগ্য সঙ্গী পেয়েছেন যার সাথে সম্পূর্ণই মানিয়ে নিতে পেরেছেন।

ব্রিটিশ পত্রিকা টেলিগ্রাফের মতে ফ্রান্স এতোদিনে যোগ্য ফার্স্ট লেডি পেয়েছে। ওঁলাদের কাছে জুলি সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন করা হলে বার বার তিনি ব্যক্তিগত বিষয় বলেই উড়িয়ে দিচ্ছেন। জুলির কাছেও ওঁলাদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা হলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ফরাসি যে পত্রিকা তাদের ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করেছে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা ঠুকে দিয়েছেন।

ওঁলাদ তার ৬০তম জন্মদিনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অস্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেও তা অস্পষ্টই থেকে যায়। তার ৬০তম জন্মদিন তিনি কোথায় কাটিয়েছেন তা তিনি মিডিয়ার সামনে আসতে দেননি।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় জুলির সাথে তার এ সম্পর্ক দুই বছর ধরে চলছে। তবে ভবিষ্যতে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন কিনা সে বিষয়ে কোনও কিছু স্পষ্ট করেননি। ধারণা করা হয় ২০১৭ সালে নির্বাচনে তাদের এই সম্পর্ক যেন প্রভাব না ফেলে তার জন্যই এতো রাখঢাক। এখন দেখা যাক ওঁলাদের হৃদয়ে পাকাপোক্তভাবেই ফরাসি সুন্দরী স্থান নিতে পারেন কিনা। নাকি অন্য কোনও দিকে এই প্রেমিকপ্রবরের উড়ু উড়ু মন চলে যায় সেটাই দেখার বিষয়।

ফরাসিরা কিন্তু তাদের প্রেসিডেন্টের এই উড়ু উড়ু মন নিয়ে একটু বিচলিত নয়। তাদের ভাষায় এটা প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। প্রেমের বিষয়ে ফ্রান্স যে কতটা উদার তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন তার এই আচরণ তিনি তার জনগণের বিষয়ে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষতঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে বারবার ভিন্ন নারীকে ফার্স্ট লেডির মর্যাদা দেওয়া দৃষ্টিকটু। ওঁলাদও বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন। যার জন্য বর্তমান নারীসঙ্গ যেন মিডিয়ার সামনে না আসে তা তিনি ভীষণ সতর্ক থাকছেন।

২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার এই কৌশল কতটা কাজে লাগে দেখা যাক।

সূত্র- টাইম ম্যাগাজিন, টেলিগ্রাফ, বিবিসি, ডেইলি মেইল অবলম্বনে : রুবাইয়া হাসনাত বর্ণা