রাজনীতিতে আসছেন জোবায়দা

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৬, ১২:৫৫

বদরুল আলম মজুমদার
ADVERTISEMENT

অর্থ পাচার মামলায় স্বামী তারেক রহমানের সাজা হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় শাশুড়ি বেগম খালেদা জিয়ারও সাজা হতে পারে। বয়স বাড়ার কারণে আগের মতো দলের দেখভাল এখন আর করতে পারছেন না খালেদা। রাজনীতিতে জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা হলে ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাছাড়া বিএনপির বেশ কয়জন সিনিয়র নেতার বিষয়ে রয়েছে তার চরম অবিশ্বাস। খালেদা জিয়াসহ দলের অধিকাংশ নেতাই সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার আশঙ্কা জন্মেছে দলে। এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে দলের ‘চেইন অব কমান্ড’। খালেদা ছাড়া কোনো নেতাই পাত্তা দিচ্ছেন না একে অন্যকে। কেউ শুনছেন না কারো কথা। অপরদিকে দিন যত যাচ্ছে সরকারের দমন-পীড়নও তত বাড়ছে। সাংগঠনিকভাবে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় দুর্দশায় রয়েছে দলটি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষয় হতে যাচ্ছে বিশাল নেটওয়ার্কের অন্যতম বৃহৎ দলটি। এসব ঘটনার ঘনঘটায় ক্রমেই অনিবার্য হয়ে উঠছেন ডা. জোবায়দা রহমানের প্রকাশ্য অভিষেক। দলের নানামুখী কঠিন বাস্তবতায় রাজনীতিতে হাল ধরছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান। দল ও পরিবারের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে এমন আভাসই পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগেও একবার জোবায়দাকে রাজনীতিতে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন খালেদা। সে সময় দেশের রাজনীতি এবং মিডিয়ার জোরালো আলোচনা ছিল ‘রাজনীতিতে আসছেন জোবায়দা’। কিন্তু তারেক রহমানের অনাগ্রহের কারণে সে আলোচনা বেশিদূর আগায়নি। তখন তারেকের পক্ষে বলা হয়েছিল, রাজনীতিতে না গিয়ে সন্তানদের সময় দিলে পরিবারের জন্য ভালো হবে। তারেকের এমন ইচ্ছায় বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়াও বেশিদূর আগাননি। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারো দলের জন্য জোবায়দার প্রয়োজন অনুভব করছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার এমন অভিব্যক্তির কথা ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে তারেককে। অর্থপাচার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তারেকও এখন ইতিবাচক চিন্তা করছেন। তিনি নিজে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনের অযোগ্য হয়েছেন এবং মামলার গতিপ্রকৃতি দেখে ধরে নিয়েছেন তার মা দলের চেয়ারপারসনও সাজা পাবেন। এমন পরিস্থিতিতে জোবায়দাকে নিয়ে নতুন চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন তারেক। তাছাড়া দলের সুপ্রতিষ্ঠিত সিনিয়র নেতারাও বিভিন্ন মামলায় সাজা পেয়ে নির্বাচনের অযোগ্য হতে পারেন। বিএনপিকে এরকম নানাবিধ সমস্যায় ফেলে আগামী বছরের যে কোনো সময় আগাম নির্বাচন দিতে পারে সরকার। সব মিলিয়ে সামনের কয়েক মাস পর বিএনপির জন্য আরো বড় ধরনের দুর্যোগ অপেক্ষা করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

একের পর এক ব্যর্থ আন্দোলনের পর বর্তমানে টালমাটাল অবস্থা অতিক্রম করছে বিএনপি। তারেকের সাজার প্রতিবাদে কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু পালন করা নিয়ে সেই চিরচেনা রূপই দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনার পর সরকার আবারো কঠোর হচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রতি। গত দুদিনে ঢাকাসহ কয়েক জেলায় জামিনে থানা নেতাদের আটকের জন্য নতুন করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এসব কারণে বাধ্য হয়ে ডা. জোবায়দাকে রাজনীতিতে আগাম অভিষেক দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন মা ও ছেলে। সে লক্ষ্যে কাজও চলছে বলে লন্ডনে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়। জানা যায়, আগামী মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহে হজ্ব পালন করতে সৌদি আরব যাচ্ছেন খালেদা। লন্ডন থেকে তারেক রহমানও সপরিবারে যাবেন সেখানে। দলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিসহ নীতিনির্ধারণী অনেক বিষয়ের সঙ্গে জোবায়দার রাজনৈতিক অভিষেকের দিনক্ষণ নিয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন মা ও ছেলে। সূত্র আরো জানায়, সবকিছু ঠিক থাকলে কোরবানির ঈদের আগে বা পরে খালেদা জিয়া লন্ডন যেতে পারেন। সেখান থেকে দেশে ফেরার সময় তিনি জোবায়দাকে সঙ্গে নিয়ে দেশে আসবেন। আর এভাবেই ঘটতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোবায়দার বর্ণিল অভিষেক।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, জোবায়দা রহমানকে রাজনীতিতে নিয়ে আসবেন বলে এর আগেও অনেক আলোচনা শুনেছি, আবারো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলের প্রয়োজনে চেয়ারপারসন তার কাজের সুবিধার জন্য জোবায়দাকে চাইলে বিএনপির রাজনীতিতে নিয়ে আসতে পারেন।

বিএনপির রাজনীতিতে জোবায়দার অভিষেক হলে পরিবারতন্ত্রের সূচনা হবে কিনা জানতে চাইলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার পর দলের চেয়ারম্যান হবেন তারেক রহমান।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারিতে এক সঙ্কটময় সময়ে দলের হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়াই নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর থেকে বেগম জিয়া একাই সামলে আসছেন সংসার আর রাজনীতির মাঠ। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকেই সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়ও পেয়েছেন তিনি। এর মাঝে গত ২১ জুলাই অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০ কোটি টাকার অর্থদন্ডসহ তাকে সাত বছরের সাজা দিয়েছে উচ্চ আদালত।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াও এখন আর আগের মতো শারীরিকভাবে সক্ষম নন। তার মাথার ওপরও রয়েছে একাধিক মামলার খড়গ। দুই-এক মাসের মধ্যেই কয়েকটি মামলার রায়ও ঘোষণা করা হতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বিএনপির আগামী দিনের কান্ডারি হিসেবেই সামনে আনা হচ্ছে জোবায়দাকে।

সরকারি ডাক্তার জোবায়দা স্বামী তারেক রহমানের সঙ্গে রয়েছেন লন্ডনে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে চাকরি হারান তিনি। ডা. জোবায়দা নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান মাহবুব আলী খানের ছোট মেয়ে। তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ নেই। তারেকের পরিবর্তে জোবায়দার পরিচ্ছন্ন ইমেজ দলের জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জোবায়দা রহমানের নিজ জেলা সিলেটে বাবার ও পরিবারের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এতদিন দেশের রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে তেমন মাথা না ঘামালেও সাম্প্রতিক সময়ে দলের তৃণমূলের অবস্থা এবং নেতৃত্ব সঙ্কটের ফলে বিএনপিতে নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন ডা. জোবায়দা। তাছাড়া রাজনীতি নিয়ে ক্লান্ত শাশুড়িকে উপযুক্ত সঙ্গ দিতে তিনি আগ্রহী বলে পরিবার সূত্র জানায়।