আরমেনীয়দের গির্জা

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ১৪:৫৩

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

একসময় পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় বিপুলসংখ্যক আরমেনীয় বসবাস করত। তাদের বসবাসের কারণেই ওই এলাকার নামকরণ হয় আরমানিটোলা।

ঐতিহাসিক মতে, অষ্টাদশ শতকে লবণ আর কাপড়ের ব্যবসার সূত্র ধরেই আরমেনীয়দের ঢাকায় আগমন। এছাড়া তারা পান, চিনি, গানপাউডার, আফিম, চামড়া ও পাটের ব্যবসা করত পুরোদমে। ঢাকার যে এলাকায় তাদের বসতি আর ব্যবসা গড়ে ওঠে, কালক্রমে তার নাম হয়ে যায় আরমানিটোলা। যেমন কলকাতায় আছে ‘আরমানি ঘাট’। উনিশ শতকে ঢাকায় পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে যে ক’টি আরমেনীয় পরিবারের নাম পাওয়া যায়, সেগুলো হলো পোগস, আরাতুন, পানিয়াটি, স্টিফান, লুকাস, কোজা, মাইকেল, মানুক, হার্নি, সিরকোর ও সার্কিস। এদের মধ্যে কারো কারো ছিল জমিদারিও। জমিদারি আর ব্যবসাই ছিল এদের বিত্তের মূল ভিত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, বিদেশি হয়েও এ দেশে তাদের জমিদারি কেনার কারণ ছিল আভিজাত্য অর্জন ও সমাজের শীর্ষে অবস্থান। ১৮৬৮ সালের ঢাকার জমিদারদের তালিকায় দেখা যায়, ছয়জন ইউরোপীয় জমিদারের মধ্যে পাঁচজনই ছিল আরমেনীয়। ঢাকার বাইরে বরিশালেও ছিল এদের জমিদারি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম, শিক্ষা বিস্তার আর সভা-সমিতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিল আরমেনীয়রা।

১৭৮১ সালে একজন বিত্তবান আরমেনীয় আগা মিনাস ক্যাটাচিক বেশ কয়েক বিঘা জমি দান করেন। পরে ওই জমিতে বিশাল গির্জা নির্মাণ করা হয়। তিনি গির্জাটির নামকরণ করেন ‘চার্চ অব দ্য রিজারেকশন’। গির্জাটির মিনার চারটি স্তরে বিভক্ত এবং কয়েকশ’ ফুট উঁচু। চার দরজা বিশিষ্ট গির্জাটিতে ৭২টি জানালা রয়েছে। গ্রিক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত গির্জাটির প্রবেশ পথটি বিশাল এবং কারুকার্যময়। যা বর্তমানে প্রাচীন খ্রিস্ট ধর্মের উপাসনালয় হিসেবে পরিচিত। এটি পুরনো ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত। গির্জা নির্মাণের পূর্বে ওই স্থানে ছিল আরমেনীয়দের একটি কবরস্থান।

১৮৮০ সালে আর্থিক অনটনে পড়ে গির্জার ঘণ্টাটি বাজানো বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে গির্জার ঘড়িঘর ধ্বংস হয়ে পড়ে। বর্তমানেও গির্জার অঙ্গনে আরমেনীয়দের কবরস্থান বয়েছে। সেই সময়ে প্রতি শুক্রবার গির্জায় উপাসনা হতো।

ঐতিহাসিক মতে, আরমেনীয়রা সম্রাট আকবরের অনুমতি সাপেক্ষে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, বসতি স্থাপন করে। তারপর তারা গির্জা নির্মাণ করে। ব্যবসার কারণে ঢাকায় আরমেনীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তারা আরমানিটোলায় বসতি স্থাপনসহ একটি ক্ষুদ্র গির্জা স্থাপন করে প্রার্থনা করার জন্য। তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে তেজগাঁও রোমান ক্যাথলিক গির্জার পাশে মরদেহ সমাহিত করা হতো।

ঢাকায় আসার অল্পদিনের মধ্যেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে আরমেনীয়রা। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আঠারো শতকের দিকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির রমরমা ব্যবসা ছিল লবণ। এই লবণ উৎপাদন এবং বিতরণের জন্য কোম্পানির ঠিকাদারি পায় আরমানীয়রা। এ ব্যবসার সাফল্য আরমেনীয়দের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। আরমানিয়ানের মধ্যে প্রথম ঢাকায় আসেন কোজা ফানুস কলন্দর। তিনি ১৬৮৮ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। এ চুক্তির সুবাদে ঢাকায় আরমানিয়ানদের অবস্থা সুদৃঢ় হয়। সেই থেকে সামাজিক প্রতিপত্তির পাশাপাশি তারা সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকায় সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য পরবর্তী সময়ে ব্যবসা ছেড়ে তারা জমিদারি কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের সুবিধা দেয়ার নামে প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল আরমানিটোলার ঝিলে জমে থাকা পানি নিঃসরণের জন্য খাল খনন। জানা যায়, ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ডস ১৯১৬ সালে ৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ধোলাই খাল থেকে আরমানিটোলা পর্যন্ত ৭২৩ ফুট দীর্ঘ, ১৮ ফুট প্রস্থ ও ১৬ ফুট গভীর একটি সংযোগ খাল খননের কাজ করান। খননকৃত খালের ওপর সে সময় একটি পুলও নির্মাণ করা হয়। পরে তাদের বংশধররা অনেকে জমিদারি বিক্রি করে কলকাতায় চলে যায়। ধারণা করা হয়, তারাই প্রথম ঢাকায় ঘোড়াগাড়ির প্রবর্তন করে। পরবর্তীতে ঘোড়াগাড়ি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। অল্পদিনেই এ গাড়ির ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে।

হেনরি ওয়ালটার্সের তথ্য মতে, ১৮৩২ সালে ঢাকায় আরমানিয়ানদের মোট বাড়ির সংখ্যা ছিল ৪২টি। আর নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১২৬ জন। ১৮৫৭ সালে ঢাকায় সিপাহি বিদ্রেহের সময় আগস্ট মাসে ঢাকা থেকে বহু আরমানিয়ান কলকাতায় পালিয়ে যায়।

কালের বিবর্তনে ঢাকার প্রভাবশালী আরমানিয়ান সম্প্রদায়ের কথা আজ অনেকেরই অজানা। বর্তমানে ঢাকায় স্বল্পসংখ্যক আরমানিয়ান দেখা মেলে। তবে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ঐতিহ্য এখনো আরমানিটোলার স্মৃতি বহন করে চলছে। আরমানিয়ান গির্জা, রূপলাল হাউস, নিকি সাহেবের কুঠি, পোগোজ স্কুল ভবন বহুকাল ধরে বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। আরমানিয়ান গির্জা কর্তৃপক্ষ জানায়, শত বছরেরও বেশি পুরনো বহু মানুষের কবর রয়েছে এ গির্জা চত্বরে। আছে উপাসনালয়। যদি কেউ এ গির্জা দেখতে চায় তাহলে গেটম্যান খুলে দেয়। আর বিকেল ৪টা থেকে সবার জন্য এটি উন্মুক্ত থাকে। এছাড়া প্রতিমাসে একবার গরিব-মিসকিনদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে তারা।