পুত্র রথীন্দ্রনাথের চোখে বাবা রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৬, ১২:০৬

অনলাইন ডেস্ক
ADVERTISEMENT

গড়াই নদে রবীন্দ্রনাথ যাচ্ছিলেন বজরায় করে। পুত্র রথীন্দ্রনাথ তখন সবে নয় বছরে পা দিয়েছে। সূর্যাস্তের পর পিতা-পুত্রের সময়টা ডেকেই কাটত। সেদিন রবীন্দ্রনাথের একটি চটি জুতা নদীতে পড়ে গেল। কোনো কথা না বলে আচমকা তিনি ঝাঁপ দিলেন পানিতে। নদীতে তখন প্রবল স্রোত! 
বাবাকে নিয়ে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথা অন দ্য এজেস অব টাইম-এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, প্রবল স্রোতে বেশ কয়েকবার খাবি খেয়ে সাঁতার কেটে তরুণ কবি নৌকায় উঠে এলেন। জুতা উদ্ধার করে রবীন্দ্রনাথের সে কী আনন্দ! 
বেশির ভাগ বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে জানেন কালজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে। কারও কাছে তিনি গুরুদেব, কারও কাছে বিশ্বকবি। তবে পুত্রের স্মৃতিকথায় উঠে আসে অন্য রকম এক খেয়ালি, আড্ডাবাজ রবীন্দ্রনাথের পরিচয়।
দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ যেমন অনেক প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি নিন্দুকের তির্যক বাক্যবাণেও কম জর্জরিত হননি। কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল (ডিএল) রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিরোধের কথা সুবিদিত। রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে প্রায়ই ব্যঙ্গ করতেন ডিএল রায়। কিন্তু প্রথম জীবনে তাঁদের দুজনের মধ্যে বেশ সখ্য ছিল। রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে কাটাতেন, ডিএল রায় তখন কুষ্টিয়ার ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি প্রায়ই আসতেন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের বাড়িতে। আর কলকাতার ঠাকুরবাড়িতে আসতেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তখনো ‘দেশবন্ধু’ হননি তিনি। আইন ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অনুপ্রাণিত করতেন। পরে তাঁদের দুজনের সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল। চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যে চিত্তরঞ্জনের সমালোচনা কখনো করেননি। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এনেছিলে সাথে করে/ মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি/ করে গেলে দান।’
শিলাইদহের বাড়িতে আসতেন বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুও। শীতকালে সপ্তাহান্তের ছুটি তিনি রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে কাটাতেই ভালোবাসতেন। তখন তিনি জীব ও জড়ের ওপর বিভিন্ন রকম উদ্দীপকের প্রভাব নিয়ে কাজ করছিলেন। গাছেরও যে অনুভূতি আছে, এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। এ কাজে তাঁকে খুব উৎসাহ দিতেন রবীন্দ্রনাথ। বন্ধু রবীন্দ্রনাথকেও উৎসাহ দিতেন জগদীশ।
রথীন্দ্রনাথের মতে, শিলাইদহে অবস্থানকালেই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের কলম সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠত। তাঁর কাছ থেকে অভিনব উপায়ে লেখা আদায়ও করা হতো। বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে সরলা দেবী তখন ভারতী সম্পাদনা করছেন। পত্রিকার জন্য মামা রবীন্দ্রনাথকে তিনি একটি ছোট নাটক লিখে দিতে অনুরোধ করেন। নাটক লিখতে ইচ্ছা করছিল না বলে রবীন্দ্রনাথ আর গা করেননি। শেষমেশ সরলা দেবী পত্রিকায় ঘোষণা দিয়ে দিলেন, পরবর্তী সংখ্যায় রবিঠাকুরের নাটক ছাপা হবে! এ ঘোষণায় রবীন্দ্রনাথ প্রথমে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। পরদিন স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে ডেকে বললেন, তিনি একটা লেখা ধরবেন। কেউ যেন বিরক্ত না করে। লেখা চলল টানা তিন দিন, বিরতিহীন। এভাবেই লেখা হলো হাসির নাটক চিরকুমার সভা। 
সাহিত্যিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ অনেক সফল ছিলেন বলে তাঁর আশপাশে গুণমুগ্ধের অভাব কখনো হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একা মানুষ। মাত্র ১৯ বছর সংসার করে ১৯০২ সালে খুব অল্প বয়সেই মারা যান স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। তাঁর মৃত্যুর মাত্র নয় মাসের মাথায় মারা যান মেজো মেয়ে রেণুকা দেবী। ১৯০৫-এ মারা গেলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৭-এ কলেরায় মারা গেলেন ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ। মেজো মেয়ে রেণুকার মতোই যক্ষ্মাতেই মারা যান মাধুরীলতা দেবী, ১৯১৮ সালে। জীবদ্দশাতেই এই তিন সন্তানকে হারান রবীন্দ্রনাথ।
বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ ও ছোট মেয়ে মীরা দেবী কেবল বেঁচে ছিলেন। রথীন্দ্রনাথ নিঃসন্তান। মীরা দেবীর দুই সন্তান—নীতীন্দ্র ও নন্দিতা। জার্মানিতে পড়াশোনা করতে গিয়ে ১৯৩২ সালে মারা যান নীতীন্দ্র। আর নন্দিতাও বিয়ের পরে নিঃসন্তান ছিলেন। অর্থাৎ বিশ্বকবির সরাসরি বংশধর বলে কেউ আর রইল না।